লেখাটির প্রথম অনলাইন প্রকাশ: Facebook and Blog (লেখকের নিজস্ব প্রোফাইল ও সাহিত্য গ্রুপ) প্রকাশের তারিখ:১৯ জুলাই, ২০২৬
ধানমন্ডি ৯/এ। লেকের পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্ট।
রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
এই সময়টায় বিল্ডিংটা এমন চুপচাপ হয়ে যায়, যেন এখানে কেউ থাকে না। শুধু গার্ডরুমের সিলিং ফ্যানটা খটখট শব্দ করে ঘুরে যায়। আর সিসিটিভি মনিটরগুলোর নীলচে আলো ঘরের ভেতর নিঃশব্দে ছড়িয়ে থাকে।
রাশেদ সেই আলোর সামনেই বসে ছিল।
প্রায় তিন মাস হলো সে এই অ্যাপার্টমেন্টে নাইট সিকিউরিটির চাকরি করছে। রাতের ডিউটিতে নতুন কিছু ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। তবু নিয়মমতো মাঝেমধ্যে মনিটরের দিকে তাকায়। আবার খবরের কাগজে চোখ নামিয়ে আনে।
আসলে তাকানোটা দায়িত্বের জন্য, আগ্রহের জন্য নয়।
এই তিন মাসে সিসিটিভির ক্যামেরাগুলো তাকে কখনো অবাক করেনি।
বিরক্ত মুখে সে পৃষ্ঠা উল্টাতে গেল। পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে অভ্যাসবশত রাশেদের চোখ চলে গেল সিসিটিভি মনিটরের দিকে। এটাও তার প্রতিদিনের কাজেরই একটা অংশ। সে জানে, সেখানে নতুন কিছু দেখার কথা নয়। তিন মাস ধরে একই দৃশ্য দেখে আসছে। একই করিডোর, একই লিফট, একই নীরবতা।
কিন্তু আজ যেন কিছু একটা আলাদা।
তৃতীয় তলার ক্যামেরায় লিফটের দরজা খুলল।
এই ভবনে দুটি লিফট। রাতের বেলায় একটি বন্ধ থাকে। অন্যটিই চলাচল করে।
দরজা খুলতেই একজন মানুষ বেরিয়ে এল।
লোকটির মাথা নিচু।
ধীরে ধীরে করিডোর ধরে হাঁটছে।
রাশেদ একটু সামনে ঝুঁকে বসল।
এত রাতে তৃতীয় তলায় কেউ হাঁটছে?
ব্যাপারটা ঠিক স্বাভাবিক মনে হলো না। এই তিন মাসে ভবনের প্রায় সব বাসিন্দাকেই সে চিনে ফেলেছে। রাতের এই নীরবতাও তার খুব পরিচিত। অথচ আজ প্রথমবারের মতো সেই পরিচিত নীরবতার ভেতর একজন অচেনা মানুষ হাঁটছে।
লোকটা হাঁটছে।
ধীরে।
একদম ধীরে।
হঠাৎ রাশেদের কপাল কুঁচকে গেল।
লোকটার হাঁটার ভঙ্গিটা...
খুব চেনা লাগছে।
সে আর দেরি করল না। মাউস হাতে নিয়ে ক্যামেরাটা জুম করল।
ধীরে ধীরে মুখটা স্পষ্ট হতে লাগল।
পরের মুহূর্তেই তার হাত থেকে খবরের কাগজটা মেঝেতে পড়ে গেল।
লোকটা সে নিজেই।
একই মুখ।
একই চোখ।
একই গোঁফ।
শুধু একটা পার্থক্য।
লোকটার গায়ে নীল সিকিউরিটি ইউনিফর্ম নেই।
পরনে কালো শার্ট।
রাশেদ কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
মনিটরের ভেতর মানুষটা তখনও করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছে।
আর সে বসে আছে গার্ডরুমে।
এটা কীভাবে সম্ভব?
আর এক মুহূর্তও বসে থাকতে পারল না রাশেদ।
গার্ডরুমের দরজা খুলে লিফটের দিকে না গিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে ছুটল।
এক নিঃশ্বাসে তৃতীয় তলায় উঠে করিডোরে এসে দাঁড়াল।
করিডোর ফাঁকা।
কেউ নেই।
সে একবার ডান দিকে তাকাল।
তারপর বাঁ দিকে।
না।
কোথাও কেউ নেই।
মনে হলো, কিছুক্ষণ আগে এখানে কেউ ছিলই না।
রাশেদ ধীরে ধীরে লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ডিজিটাল ডিসপ্লেতে জ্বলছে—
৫
তার স্পষ্ট মনে আছে, সর্বশেষ লিফটে উঠেছিলেন ৫-এ ফ্ল্যাটের কবির স্যার। সেই হিসেবে লিফটের পাঁচ তলাতেই থাকার কথা।
তাহলে একটু আগে সে কী দেখল?
কে তৃতীয় তলায় নেমে করিডোর ধরে হাঁটছিল?
আর লোকটা দেখতে ঠিক তার মতো কেন?
কোনো উত্তর খুঁজে পেল না রাশেদ।
নিচে যাওয়ার জন্য সে লিফটের বাটনে চাপ দিল।
লিফট নামতে শুরু করল।
৫...
৪...
৩...
টিং।
দরজা খুলে গেল।
ভেতরে সবকিছু স্বাভাবিক।
রাশেদ লিফটে ঢুকে G বাটনে চাপ দিল।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
লিফট নিচে নামতে শুরু করল।
৩...
২...
১...
G
দরজা খুলতেই রাশেদ প্রায় দৌড়ে গার্ডরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
গার্ডরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল রাশেদ।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল।
মনে হলো, সে হয়তো ভুল দেখেছে। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, টেরই পায়নি।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—এর বেশি কিছু নয়।
প্রথমেই চোখ গেল সিসিটিভি মনিটরগুলোর দিকে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
করিডোর ফাঁকা।
লিফট বন্ধ।
কোথাও কেউ নেই।
রাশেদ চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতলটা হাতে নিল।