ধরণ: প্রবাস জীবন ও মানবিক সম্পর্কের গল্প
প্রকাশের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মাধ্যম: Facebook এবং ব্লগ এ (লেখকের নিজস্ব প্রোফাইল ও সাহিত্য গ্রুপ এ )
জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে আয়ারল্যান্ডে। প্রায় দশ বছর।
বিদেশের জীবন অনেক কিছু শেখায়। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা অন্যরকম হয়ে যায়। তবে সব অভিজ্ঞতা যে সুখের হয়, তা নয়।
আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় ৭ থেকে ৮ বার বর্ণবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। বেশিরভাগ ঘটনাই ছিল ছোটখাটো। কিছু কথা, কিছু আচরণ—যেগুলো হয়তো কয়েক মিনিট পর ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের মনে কিছু কিছু ঘটনা দাগ রেখে যায়।
এর মধ্যে একটি ঘটনা আজও মনে আছে। ঘটনাটি এতটাই দূর গিয়েছিল যে রক্ত পর্যন্ত ঝরেছিল। শেষ পর্যন্ত Garda—আয়ারল্যান্ডের পুলিশ—এসে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছিল।
সেদিন আমাকেও Garda Station-এ যেতে হয়েছিল। বলা যায়, আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল—যদিও আসলে ব্যাপারটা ছিল জিজ্ঞাসাবাদ। কিছুক্ষণ পর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সেই দিনের গল্পটা আজ বলব।
কারণ কিছু ঘটনা শুধু মনে রাখার জন্য নয়, কখনো কখনো বলার জন্যও হয়।
সেই দিনের গল্পে যাওয়ার আগে, ছোট্ট করে কিছু কথা বলে নেওয়া ভালো। এতে পাঠক বুঝতে পারবেন—কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে ঘটনাটা ঘটেছিল।
আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় আমার একটা ছোট্ট বন্ধুদের দল হয়ে গিয়েছিল। কেউ ছিল আমার ক্লাসমেট, কেউ আবার কর্মক্ষেত্রের পরিচিত। বিদেশের মাটিতে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও ধীরে ধীরে একটা আপন সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
এই জায়গায় একটা কথা বলে রাখা ভালো—আমাদের সেই গ্রুপে আমি ছিলাম একমাত্র সাউথ এশিয়ান। আরেকজন এশিয়ান ছিল, সে চীনের নাগরিক। এছাড়া আমাদের গ্রুপে আইরিশ, পোলিশ ও জার্মান বন্ধুরাও ছিল। যাদের সাধারণভাবে আমরা “হোয়াইট” বা সাদা চামড়ার মানুষ হিসেবে জানি।
তবে বন্ধুত্বের জায়গায় কখনো এই পার্থক্যগুলো আমাদের মধ্যে আসেনি। কে কোন দেশ থেকে এসেছে, কার গায়ের রঙ কেমন—এসব কখনো আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি।
সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে আমরা প্রায়ই একসঙ্গে বের হতাম। কখনো ঘুরতে যাওয়া, কখনো আড্ডা—এইভাবেই সময় কেটে যেত।
সেদিনও তেমনই একটা উইকেন্ড ছিল। আমরা সবাই একটা নাইটক্লাব থেকে বের হয়েছি। রাত তখন বেশ গভীর। হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে সবাই বাসার দিকে ফিরছি।
বিদেশের শহরের রাতগুলো একটু অদ্ভুত। চারপাশে আলো থাকে, মানুষ থাকে, কিন্তু একটা সময় পর সবাই নিজের নিজের পথে চলে যায়।
আমাদের দলটাও ধীরে ধীরে ছোট হতে লাগল। যার বাসার রাস্তা পড়ছে, সে হাত নেড়ে বিদায় নিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও যে দলটা বড় ছিল, একসময় সেখানে শুধু দুজন মানুষ বাকি থাকল।
আমি আর Sinead।
এখানে Sinead সম্পর্কে একটু বলে রাখা দরকার।
Sinead ছিল আইরিশ মেয়ে। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল কর্মক্ষেত্রে।
আয়ারল্যান্ডে যাওয়ার পর তখন মাত্র ছয় মাস হয়েছে আমার। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। ইংরেজিতেও খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। তাই তখন আমাকে কিচেন পোর্টারের কাজ করতে হতো।
কাজটা খুব কঠিন ছিল না, কিন্তু শারীরিক পরিশ্রম অনেক। সারাদিন রান্নাঘরে কাজের পর যখন অনেক কাপ-প্লেট জমে যেত, তখন বেশিরভাগ মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু মাঝে মাঝে দুজন মানুষ এগিয়ে আসত।
Sinead আর Trisha।
Trisha-এর কথা অন্য কোনো দিন বলব।
সেই সময় থেকেই Sinead-এর সঙ্গে আমার পরিচয়।
ধীরে ধীরে বুঝলাম, Sinead একটু অন্য ধরনের মানুষ। পড়াশোনা খুব বেশি করেনি। একটু বাউন্ডেলে স্বভাবের ছিল। আমাদের দেশে যাকে অনেকে “মাস্তান টাইপ” বলে, অনেকটা সেরকম।
চটপটে, মুখের ওপর কথা বলতে পারে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায় না। প্রয়োজন হলে গালাগালি করত, ঝগড়াতেও পিছিয়ে যেত না। অনেক ছেলেকেও দেখেছি ওকে একটু ভয় পেতে।
আমি মজা করে মাঝে মাঝে ভাবতাম, ওকে যদি “বেডা মানুষ” বলি, হয়তো খুব একটা ভুল হবে না।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
ওর হাসি আর চোখ—এই দুই জিনিসের কাছে এসে সেই কঠিন ভাবটা আর থাকে না।
সময় যেতে যেতে Sinead শুধু সহকর্মী থাকেনি, ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল।
আর যে বন্ধুদের গ্রুপের কথা বলছিলাম, সেই গ্রুপটাও আসলে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল। আমার পরিচয়ের মাধ্যমেই সবাই একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।
আইরিশ, পোলিশ, জার্মান, চাইনিজ—ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানুষ ছিল আমাদের সেই ছোট্ট দলে।
মোটামুটি ১৩ জনের একটা গ্রুপ।
বিদেশের মাটিতে এই মানুষগুলোই একসময় আমার নিজের মানুষের মতো হয়ে গিয়েছিল।
যাই হোক, মূল ঘটনায় ফিরে আসি।
শেষ পর্যন্ত আমি আর Sinead আলাদা হলাম।
পরিকল্পনা ছিল, আমার বাসার কাছে যে ট্যাক্সি বুথটা আছে, সেখান থেকে ও ট্যাক্সি নেবে। কারণ Sinead-এর বাসা ছিল কাউন্টির দিকে।
তবে তার আগে একটা কাজ বাকি ছিল।
ওর স্পাইসি কাবাব খেতে হবে।
এটা ছিল প্রায় প্রতি উইকেন্ডের নিয়ম। Sinead-এর কাছে কাবাব যেন একটা ছোট্ট আবদারের মতো ছিল। ছোট বাচ্চাদের মতো আবদার করত, কিন্তু সে মোটেও ছোট বাচ্চা ছিল না।
বরং ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী, অসম্ভব চটপটে এক মেয়ে।
আমরা গল্প করতে করতে হাঁটছিলাম।
আমার বাসার ঠিক উল্টো পাশে একটা পাকিস্তানি কাবাবের দোকান ছিল। দোকানের পাশেই ছিল ট্যাক্সি বুথ।
দোকানের মালিক ছিলেন আরশাদ ভাই।
আরশাদ ভাই সম্পর্কে একটা কথা বলে রাখা দরকার। তিনি জন্মসূত্রে পাকিস্তানি ছিলেন। পাকিস্তানেই জন্ম, পাকিস্তানেই বড় হওয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি সবসময় নিজেকে বাংলাদেশি পরিচয় দিতেন। কেন দিতেন, সেই গল্পটা এই ঘটনার মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
আমি আর Sinead দোকানে ঢুকলাম।
আমাদের দেখে আরশাদ ভাই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,
— কেমন আছো?
আর একটা ছোট্ট বিষয় এখানে বলে রাখা দরকার। আরশাদ ভাই এই কথাটা বাংলাতেই বলেছিলেন, Sinead-কে উদ্দেশ্য করে। কারণ Sinead অন্যদের মতো “How are you?” বলত না। সে মজা করে প্রায়ই বলত, " কিমুন আছো "
বিদেশের মাটিতে থেকেও ছোট ছোট কিছু অভ্যাস মানুষকে একে অন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
আমরা দুজনই স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম ,
— ভালো আছি।
Sinead একটু জোরে কথা বলার মানুষ ছিল। বিশেষ করে একটু বেশি ড্রিঙ্ক করলে তার গলার আওয়াজ আরও বেড়ে যেত।
সে হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
— Arshad, would ya fix me up with a real hot kebab, so? Cheers. ( আরশাদ, আমার জন্য একটা একদম গরম ঝাল কাবাব বানিয়ে দাও তো। চিয়ার্স।”)
আরশাদ ভাই Sinead-কে আগে থেকেই চিনতেন। কারণ ড্রিঙ্ক করার পর প্রায়ই সে আমার সঙ্গে এই দোকানে আসত। তাই তার স্বভাব সম্পর্কেও আরশাদ ভাইয়ের ভালো ধারণা ছিল।
Sinead-এর কথা শুনে আরশাদ ভাই হেসে বললেন,
— Aray yaar, forget the kebab. You drank too much already. Last time you promised me you won’t. You are my sister, and it makes my heart hurt when I see you like this. ( আরে ইয়ার, কাবাবের কথা বাদ দাও। তুমি এরই মধ্যে অনেক বেশি ড্রিঙ্ক করে ফেলেছো। গতবার তো আমাকে কথা দিয়েছিলে, আর এমন করবে না। তুমি আমার বোনের মতো। তোমাকে এভাবে দেখলে আমার সত্যিই খারাপ লাগে, কষ্ট হয়। )
আরশাদ ভাইয়ের কথা শুনে Sinead হাসতে হাসতে বলল,
— Nooo lads, I just had the five packs, go on, ask Shon yourself. ( “না না, আমি তো শুধু পাঁচ প্যাকই খেয়েছি। যাও, Shon-কে জিজ্ঞেস করো, সে নিজেই বলবে।” )
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। আয়ারল্যান্ডে আমার বেশিরভাগ বন্ধু আমাকে Shon নামে ডাকত। আমার আসল নামের চেয়ে এই নামটাই তাদের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে গিয়েছিল।
আরশাদ ভাই হাসলেন।
তারপর বললেন,
— Theek hai yaar, I believe you. Chalo, sit karo, sumon will fix a hot kabab for you. ( ঠিক আছে ইয়ার, আমি তোমাকে বিশ্বাস করলাম। চলো, গিয়ে বসো। সুমন তোমার জন্য একটা গরম কাবাব বানিয়ে দেবে। )
Sinead দোকানের কাস্টমার বসার জায়গায় গিয়ে বসল।
সেখানে তখন মাত্র দুজন ছেলে বসে ছিল। বাকি সব চেয়ার খালি।
ঘটনাটা বোঝার জন্য আরশাদ ভাইয়ের দোকানটার একটু বর্ণনা দেওয়া দরকার।
দোকানটা খুব বড় ছিল না। ছোট্ট একটা জায়গা। এক পাশে ছিল রান্নার অংশ—যেখানে নান, রুটি আর কাবাব তৈরি হতো। একটা হট স্টিল, একটা চুলা আর পাশে রাখা থাকত বিভিন্ন ধরনের সস।
কিচেন থেকে একটু দূরে ছিল কাস্টমারদের বসার জায়গা। খুব বেশি না, মোটামুটি ১০ থেকে ১২ জন বসতে পারত। কেউ চাইলে সেখানে বসে খাবার খেত, তবে বেশিরভাগ মানুষই আসত টেকওয়ের জন্য। কেউ খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকত, কেউ আবার খাবার নিয়ে চলে যেত।
দোকানটার একটা ছোট্ট সমস্যা ছিল। কিচেন থেকে কাস্টমারদের বসার জায়গাটা সরাসরি দেখা যেত না।
আমার বাসার ঠিক উল্টো পাশেই ছিল আরশাদ ভাইয়ের দোকান। উনি একাই দোকান সামলাতেন। তবে উইকেন্ডে কখনো ভিড় বেশি হলে আমাকে ডাকতেন সাহায্য করার জন্য।
আমি যেতাম।
এই কারণে দোকানটার সঙ্গে আমার একটা আলাদা পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কোন কাবাব কীভাবে বানাতে হয়, কোনটার দাম কত—সবই আমার জানা ছিল।
সেদিনও আমি জানতাম না, এই ছোট্ট দোকানটাই কিছুক্ষণ পর এমন একটা ঘটনার সাক্ষী হবে, যেটা এত বছর পরও আমার মনে স্পষ্ট হয়ে আছে।
Sinead-এর কাবাবের অর্ডার নেওয়ার পর আরশাদ ভাই আমাকে বললেন,
— সুমন, কাজের চাপ একটু বেশি। যদি পারো, Sinead-এর কাবাবটা তুমি বানিয়ে দাও। পারলে আরও দুটো কাবাব বানিয়ে রেখো। আমি একটা সিগারেট খেয়ে আসি।
ছোট্ট একটা কথা বলে রাখা দরকার। আরশাদ ভাই পাকিস্তানি ছিলেন। জন্ম পাকিস্তানে, বড়ও হয়েছেন সেখানেই। কিন্তু তিনি খুব সুন্দর বাংলা বলতে পারতেন। কারণ তাঁর বাবা-মা দুজনই বাঙালি ছিলেন।
আমি বললাম,
— ওকে ভাই, আপনি যান। Sinead-এর কাবাব দিয়ে ওরে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে আপনাকে আবার হেল্প করব , তারপর আপনি একটু রেস্ট নিয়েন।
আমি কিচেনে ঢুকে Sinead-এর জন্য কাবাব বানাতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আরশাদ ভাই সিগারেট খেয়ে ফিরে এলেন। আমরা দুজন কাবাব বানাতে বানাতে গল্প করছিলাম।
হঠাৎ কাস্টমারদের বসার জায়গা থেকে একটা চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এলো।
প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। কারণ Sinead একটু বেশি ড্রিঙ্ক করলে মাঝে মাঝে জোরে কথা বলত।
আরশাদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সুমন, একটু দেখে আসো তো, কী হয়েছে?
আমি হেসে বললাম,
— আজকে Sinead একটু বেশি ড্রিঙ্ক করেছে। ও যেদিন বেশি ড্রিঙ্ক করে, সেদিন এমন একটু চেঁচামেচি করে। চিন্তার কিছু নেই।
আমরা আবার কাবাব বানানোতে মন দিলাম।
কিন্তু চেঁচামেচি থামল না।
বরং ধীরে ধীরে শব্দ বাড়তে লাগল। Sinead-এর গলার আওয়াজই বেশি শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে গালাগালির শব্দও আসছিল।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আজকে ট্যাক্সি ড্রাইভারের অবস্থা খারাপ হবে। Sinead-কে ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়াটাই আজকের সবচেয়ে ঝামেলার কাজ হবে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু পরের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যা হলো, সেটা আমরা কেউই কল্পনা করিনি।
হঠাৎ চেঁচামেচির সঙ্গে মারামারির শব্দ শুরু হলো।
আমরা দুজন সঙ্গে সঙ্গে কিচেন কাউন্টার থেকে বের হয়ে কাস্টমারদের বসার জায়গার দিকে দৌড় দিলাম।
সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে আমি আর আরশাদ ভাই দুজনই কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলাম।
একজন ছেলে মেঝেতে পড়ে আছে। তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে।
আরেকজন ছেলের নাক দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। সে প্রচণ্ড রাগে Sinead-এর দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে।
কিন্তু Sinead তখনও শান্ত হয়নি। বরং মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
আমি দ্রুত গিয়ে Sinead-কে থামানোর চেষ্টা করলাম।
আরশাদ ভাই ওই ছেলেটাকে ধরে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ছেলেটাও এতটাই উত্তেজিত ছিল যে, বারবার Sinead-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
আরশাদ ভাই তাকে ধরে না রাখলে হয়তো আবার ঝামেলা শুরু হয়ে যেত।
এর মধ্যেই Sinead মেঝে মোছার Mop handle তুলে নিয়েছে। মারার জন্য , তার চোখেমুখে তখন এমন একটা রাগ, যা আমি আগে কখনো দেখিনি।
আমি আর আরশাদ ভাই দুজনেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
কী হয়েছে?
কেন তারা এভাবে মারামারি করছে?
আর একজনই বা মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে কেন?
আমরা তখনও কিছুই বুজতে পারছিলাম না ।
আরশাদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সুমন, কী করব? Garda-কে খবর দিতে হবে। কিন্তু Sinead বিপদে পড়ে যাবে।
আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না কী করা উচিত।
পাঁচ বছর ধরে Sinead-কে চিনি।
এই দীর্ঘ সময়ে ওর স্বভাব, আচরণ—প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। ওকে কখনো রাগতে দেখিনি।
অবশ্য Sinead একটু জোরে কথা বলত। অনেক সময় ওর কথা শুনে মনে হতো, হয়তো রেগে গেছে। কিন্তু আসলে সেটা ছিল ওর স্বাভাবিক ভঙ্গি।
হাসিখুশি, প্রাণবন্ত একটা মেয়ে ছিল Sinead। সবসময় নিজের মতো করে থাকতে পছন্দ করত।
কিন্তু সেদিনের Sinead যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ।
তার চোখেমুখে এমন একটা রাগ দেখেছিলাম, যেটার সঙ্গে আমি আগে কখনো পরিচিত ছিলাম না।
কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না—এই কি সেই Sinead, যাকে আমি গত পাঁচ বছর ধরে চিনি?
তার চোখেমুখে এমন একটা রাগ ছিল, যেটা আমার একদম অচেনা।
কেন এমন হলো?
কী কারণে এই মারামারি?
কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলেটার অবস্থা দেখে আমি আরশাদ ভাইকে বললাম Garda-কে ফোন দিতে। কারণ তখন আর অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
তবে একটা বিষয় সত্যি—তখনও আমরা কেউ জানতাম না আসল ঘটনা কী।
আমি Sinead-কে একটু শান্ত করার চেষ্টা করলাম। তারপর কিচেনের পাশের একটা চেয়ারে গিয়ে বসালাম।
কিছুক্ষণ পর Garda এলো। সঙ্গে এলো দুটো অ্যাম্বুল্যান্স।
মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলেটাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। যার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল, তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলো। Sinead-ও সামান্য আহত হয়েছিল, তাকেও চিকিৎসা দেওয়া হলো।
সবাই ব্যস্ত, কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
আসলে কী হয়েছিল?
Garda প্রথমে আরশাদ ভাইকে জিজ্ঞেস করল।
কী হয়েছে?
আরশাদ ভাই যতটুকু জানেন, সব বললেন। এরপর Garda আমার দিকে ফিরে জানতে চাইল—আমরা কোন নাইটক্লাবে গিয়েছিলাম, Sinead কতটা ড্রিঙ্ক করেছিল, আরও কিছু বিষয়।
আমি Sinead-এর ড্রিঙ্ক করার পরিমাণ নিয়ে কিছুটা কম বললাম। হয়তো সেটা ঠিক ছিল না। কিন্তু তখন আমার মাথায় শুধু একটা চিন্তাই ছিল—Sinead যেন বড় কোনো সমস্যায় না পড়ে।
এর মধ্যে Sinead অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছে।
একজন মহিলা Garda তার পাশে দাঁড়িয়ে বারবার বলছিল,
— Cool down, cool down. ( শান্ত হও, একটু শান্ত হও।)
অন্যদিকে Garda আহত ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করছিল কী হয়েছিল।
কিন্তু ছেলেটা তখন ঠিকভাবে কথাই বলতে পারছিল না। তার কথাগুলো এলোমেলো। বোঝা যাচ্ছিল, সে অতিরিক্ত মাতাল। তারপর তাকে ব্রেথালাইজার মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করা হলো। এই মেশিন দিয়ে শরীরে অ্যালকোহলের পরিমাণ বোঝা যায়।
রিপোর্ট দেখে Garda বুঝতে পারল, ছেলেটার এখন স্বাভাবিকভাবে কথা বলার অবস্থাই নেই।
তার ফলাফল ছিল ০.১৯%।
এরপর Sinead-এর পরীক্ষা করা হলো। তার ফলাফল ০.১২%।
আর আমার ছিল ০.০৫%।
প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্বিতীয় অ্যাম্বুল্যান্স চলে গেল।
এরপর Garda সিদ্ধান্ত নিল—Sinead এবং ওই ছেলেকে নিয়ে যেতে হবে। সাথে আমাকেও নিয়ে যাবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য
ঠিক তখন আরশাদ ভাই বাধা দিলেন।
তিনি বললেন,
— ভাই, যদি সম্ভব হয় বিষয়টা এখানেই মিটিয়ে ফেলেন। Sinead-কে আমি চিনি, ও এমন মেয়ে না—ও আমার বোনের মতো। আমি সত্যিই চাই না ওকে Garda Station পর্যন্ত যেতে হোক।
Garda শান্তভাবে বলল,
— দেখো, এখন তোমার ব্যবসার ব্যস্ত সময়। এখানে দাঁড়িয়ে যদি বিষয়টার সমাধান করতে চাও, তাহলে তোমার কাজের সময় নষ্ট হবে। আর এর ক্ষতি শেষ পর্যন্ত তোমাকেই বহন করতে হবে।
আরশাদ ভাই উত্তর দিলেন,
— লস হলে হোক , আমি দোকান বন্ধ করে দিচ্ছি , তোমরা ব্যাপারটা টা , এই খানে মিটিয়ে ফেলো , তোমরা ক্যামেরার ফুটেজটা তা দেখো , যদি Sinead-এর দোষ থাকে, তাহলে তাকে নিয়ে যান, আমার কোনো আপত্তি নেই।
Garda কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ঠিক আছে। তুমি যেটা ভালো মনে কর
এরপর Garda প্রথমে Sinead-এর কাছে গেল।
— এখন কেমন লাগছে?
Sinead বলল,
— আমি ঠিক আছি।
— আমাদের সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় আছো?
— Yeah
Garda জিজ্ঞেস করল,
— তাহলে বলো, কী হয়েছিল? তুমি ওই দুই ছেলেকে আঘাত করলে কেন?
Sinead কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— ওরা আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে অপমান করেছে। আমাকে আর আমার বন্ধুকে আলাদা করে দেখেছে। শুধু গায়ের রঙের কারণে ওকে ছোট করেছে।
তারপর Sinead বলল,
— আমি ওদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম।
Sinead বলেছিল,
— আইরিশ আইনে এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কারও গায়ের রঙ নিয়ে অপমান করা বা তাকে আলাদা করে দেখা আইনবিরোধী।
কিন্তু ছেলেগুলো তখন বলেছিল,
— ওই কালো লোকটার কথা বাদ দাও। আমাদের সঙ্গে এসো, আজ রাতে আরও মজা হবে।
এই কথাটাই Sinead নিতে পারেনি।
রাগের মাথায় সে আঘাত করে বসে।
এটাই ছিল Sinead-এর সরল উত্তর।
পরে CCTV ফুটেজ দেখা হলো।
ফুটেজে দেখা গেল, ছেলেগুলো প্রথমে Sinead-কে উত্তেজিত করছিল। Sinead কিছুক্ষণ তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক শুরু হয়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—প্রথম আঘাতটা Sinead-ই করেছিল।
একজন ছেলে তখনও হাসপাতালে।
তাই নিয়ম অনুযায়ী Sinead-কে আটক করা ছাড়া Garda-এর আর কোনো উপায় ছিল না। আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো, আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে না। তবে পরদিন সকাল ৯টার মধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য Garda Station-এ উপস্থিত থাকতে হবে। আমার Social Security Card-টাও তারা রেখে দিল। বলল, পরদিন Garda Station-এ গেলে সেটা ফেরত দেওয়া হবে।
আমার আর আরশাদ ভাইয়ের মন খারাপ হয়ে গেল।
তবে Garda আমাদের আশ্বস্ত করল।
সে বলল, যদি ওই ছেলেরা কোনো অভিযোগ না করে এবং Sinead-ও অভিযোগ না করে, তাহলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে বিষয়টি এখানেই শেষ করা সম্ভব।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত Sinead আর ওই ছেলেটিকে Garda নিয়ে গেল।
আমি অনুরোধ করলাম, আমাকেও যেন Garda Station-এ যেতে দেওয়া হয়। যদি কোনো প্রয়োজন হয়, আমি কথা বলব।
Garda আমাকে যেতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু তারপরও আমি গেলাম।
কেন গেলাম, সেটা হয়তো তখন নিজেও ঠিক জানতাম না। শুধু মনে হচ্ছিল, এই অবস্থায় Sinead-কে একা ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না।
Garda Station-এ পৌঁছে Sinead-এর সঙ্গে দেখা হলো।
আমি বললাম,
— Sinead, I am here. You just go to the cell and have a little sleep. You will be fine. ( Sinead, আমি এখানে আছি। তুমি চিন্তা করো না। এখন সেলে গিয়ে একটু ঘুমাও। সব ঠিক হয়ে যাবে। )
এখন Sinead পুরোপুরি শান্ত।
কিছুক্ষণ আগের সেই রাগী মানুষটার সঙ্গে এই Sinead-কে মিলানো কঠিন ছিল।
সে হাসিমুখে বলল,
— You head on home, sure nothin’ will happen. If they don’t make a complaint, I won’t either. But if they do, I’ll be makin’ one meself. (তুমি বাসায় চলে যাও। চিন্তা করো না, কিছু হবে না। ওরা যদি অভিযোগ না করে, আমিও কোনো অভিযোগ করব না। কিন্তু ওরা যদি করে, তাহলে আমিও নিজের পক্ষ থেকে অভিযোগ করব। )
একটা কথা বলে রাখা ভালো, আমার সঙ্গে পরিচয়ের আগেও Sinead কয়েকবার মারামারির কারণে Garda-এর ঝামেলায় পড়েছিল। তখন সে ছিল কিশোরী, বয়স কম ছিল, কিছুটা উচ্ছৃঙ্খলও ছিল। তাই অভিযোগ, আইনগত প্রক্রিয়া—এসব বিষয়ে তার ধারণা আমার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। সে জানত, কেউ অভিযোগ না করলে অনেক কিছুই সহজভাবে মিটে যেতে পারে। বিষয়টা আমি তখন জানতাম না।
তবে আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর আমি Sinead-কে অন্যরকম একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছি।
আমি আর কিছু বললাম না।
শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম, Sinead ধীরে ধীরে সেলের দিকে চলে যাচ্ছে। কিছু কিছু মুহূর্তে মানুষের বলার মতো অনেক কথা থাকে, কিন্তু বলা হয় না।
সেদিন আমার অবস্থাও ছিল তেমন।
আমি সারা রাত Garda Station-এর রিসেপশনে বসে রইলাম।
আরশাদ ভাই বারবার ফোন দিচ্ছিলেন। ওখানকার পরিস্থিতি জানতে চাইছিলেন।
কিন্তু আমার চিন্তা ছিল অন্য জায়গায়। যে ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার কী অবস্থা?
বারবার রিসেপশনে গিয়ে জানতে চাইছিলাম, হাসপাতাল থেকে কোনো খবর এসেছে কি না।
এর মধ্যে Sinead-এর মা সুজানাকে ফোন করেছিলাম। তিনি ফোন ধরেননি। সম্ভবত ঘুমিয়ে ছিলেন, কিংবা …………..।
Sinead-এর সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। Sinead-এর জীবনের অনেক কিছু দেখার পর মাঝে মাঝে মনে হতো, এই মেয়েটার অস্থির জীবনের পেছনে এই মহিলা যে দায়ী, তা যে কেউ দেখলে এককথায় বলে দিতে পারবে।
একজন মা কীভাবে নিজের সন্তানের কাছ থেকে এতটা দূরে থাকতে পারেন—সেটা সুজানাকে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।
ফোনে করার জন্য ফোন করছি , যেহেতু ফোন ধরে নাই আমি আর ফোন করি নাই , আর ফোন ধরলে যে অনেক কিছু হয়ে যাবে সেটাও না।
কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল থেকে খবর এলো।
ছেলেটা ভালো আছে।
নাকে সামান্য আঘাত পেয়েছে। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে সে অনেকটা অচেতন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আঘাতটা গুরুতর নয়।
খবরটা শুনে বুকের ভেতর জমে থাকা একটা চাপ যেন একটু কমে গেল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে আরশাদ ভাইকে ফোন করলাম।
সব শুনে তিনিও আমার মতো একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
তারপর শুধু বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ।
সারা রাত Garda Station-এ বসে থাকার পর সকাল হলো। সকাল দশটার দিকে হাসপাতাল থেকে ওই ছেলেটিকে Garda Station-এ নিয়ে আসা হলো।
Sinead আর ওই ছেলেটিকে সেল থেকে বের করে একটা রুমে নেওয়া হলো। সাথে আমাকেও
তিনি আরও বললেন, যদি দুই পক্ষ এখনই বিষয়টা মিটিয়ে নেয়, তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। না হলে বিষয়টি কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারে।
আমাকে দেখে Sinead অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— Yer still here, is it? Did ya go home at all or spend the whole night here? ( তুমি এখনো এখানে? তুমি কি বাসায় যাওনি, নাকি পুরো রাতটাই এখানে বসে কাটিয়ে দিলে? )
আমি শুধু বললাম,
— How can I go home while you are here? ( তোমাকে এই অবস্থায় রেখে আমি কীভাবে বাসায় ফিরে যাই? )
আমার কথাটা শুনে Sinead কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর তার মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। হয়তো সে বুঝেছিল—বন্ধুত্বের কিছু জায়গায় কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না।
Sinead, ওই দুই ছেলে আর আমি—আমাদের নিয়ে তিনজন Garda একটা ছোট রুমে ঢুকল। ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা ছিল।
কালরাতে যেখানে রাগ, চিৎকার আর মারামারি ছিল, এখন সেখানে সবাই চুপচাপ বসে আছে।
একজন Garda প্রথমে ওই দুই ছেলের দিকে তাকালেন।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
— আইরিশ আইনে কেউ যদি বর্ণবাদের মতো অপরাধ করে, তাহলে তার শাস্তি অনেক গুরুতর হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত তোমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ করা হয়নি। যদি অভিযোগ হয় এবং সেটা প্রমাণিত হয়, তাহলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
তিনি একটু থামলেন।
তারপর বললেন,
— তবে তোমরা সরাসরি আক্রমণাত্মক আচরণ করোনি, তাই বাস্তবে শাস্তি হয়তো কয়েক মাসের জেল এবং জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এরপর Garda Sinead-এর দিকে তাকালেন।
বললেন,
— কিন্তু তোমার ক্ষেত্রেও একটা বিষয় আছে। প্রথম আঘাতটা তুমি করেছো। আইন অনুযায়ী এর শাস্তিও হতে পারে। সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে। তবে যেহেতু আঘাতটা তুলনামূলকভাবে গুরুতর নয়, বাস্তবে শাস্তি হয়তো অনেক কম হবে।
Garda খুব সংক্ষেপে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন।
শেষে বললেন,
— এখন সিদ্ধান্ত তোমাদের। তোমরা কী করতে চাও, সেটা তোমরাই ঠিক করো।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ওই দুই ছেলে একসঙ্গে বলল,
— আসলে আমরা ড্রাঙ্ক ছিলাম। পুরো ঘটনার জন্য আমরা দুঃখিত।
তারপর তারা আমার দিকে তাকাল।
একজন বলল,
— আমরা আসলে তোমাকে ছোট করার জন্য কিছু বলতে চাইনি। কিন্তু যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। আমরা সত্যিই দুঃখিত।
আমি কিছু বলার আগেই Sinead কথা বলল।
সে বলল,
— আমিও দুঃখিত। প্রথমে এভাবে আঘাত করা আমার ঠিক হয়নি। সুমন আমার খুব ভালো বন্ধু। ওকে কেউ অপমান করলে আমার খারাপ লাগে। হয়তো সেই রাগটা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।
তারপর একটু থেমে বলল,
— আমিও দুঃখিত।
সবাই যখন নিজের নিজের ভুল স্বীকার করছে, তখন মনে হচ্ছিল—মানুষের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা হয়তো এটাই। ভুল করা নয়, ভুল বুঝতে পারাটাই বড় বিষয়।
এরপর Garda আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— তোমার কোনো অভিযোগ আছে?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
— না, আমার কোনো অভিযোগ নেই।
Garda মাথা নেড়ে বললেন,
— আমরা একটা প্রাথমিক রেকর্ড রাখছি। তবে এটাকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করছি না। তোমরা যেতে পারো।
কথাটা শুনে মনে হলো, বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেল। আমরা সবাই উঠে রুম থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।
ঠিক তখনই হাসপাতালে নেওয়া সেই ছেলেটা আমার কাছে এসে দাঁড়াল।
সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি তোমাকে কোনোভাবে ছোট করতে চাইনি। দয়া করে কিছু মনে করো না।
আমি শুধু বললাম,
— আমি কিছু মনে করিনি।
আমরা Garda Station থেকে বের হয়ে আসছিলাম।
হঠাৎ এক Garda Sinead-এর দিকে তাকিয়ে মজা করে বললেন,
— Ah, you’re very lucky, sure your lad loves ya to bits. ( আরে, তুমি তো বেশ ভাগ্যবতী। তোমার এই বন্ধু তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে। )
আমি শুনে হেসে ফেললাম।
Sinead-ও হাসতে হাসতে উত্তর দিল,
— Ah no, he’s not my boyfriend. He’s my best mate. ( আরে না, ও আমার বয়ফ্রেন্ড না। ও আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। )
কথাটা শুনে আমারও হাসি পেল।
কিছু সম্পর্কের নাম হয় না।
তারা শুধু থেকে যায়।
আমরা Garda Station থেকে বের হয়ে এলাম।
ওই ছেলেগুলোও বের হলো। বের হওয়ার সময় হাসপাতালে নেওয়া সেই ছেলেটা আবার আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আরেকবার দুঃখ প্রকাশ করল।
আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম,
— ঠিক আছে।
এরপর Sinead-কে ট্যাক্সিতে তুলে দিলাম। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে বাসার দিকে ফিরলাম।
আপনাদের হয়তো জানতে ইচ্ছে করছে—Sinead-এর সঙ্গে এখনো আমার যোগাযোগ আছে কি না।
উত্তর হলো—ছিল।
কিন্তু এখন আর নেই।
কারণ Sinead এমন এক জায়গায় চলে গেছে, যেখানে চাইলেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব নয়।
২০২২ সালের একদিনের কথা।
হঠাৎ এরশাদ ভাইয়ের ফোন পেলাম। তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা।
তিনি জানালেন, একটা সড়ক দুর্ঘটনায় Sinead আর তার boyfriend Richard মারা গেছে।
কিছু কিছু খবর মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেয়।
সেদিনও আমি থেমে গিয়েছিলাম।
আয়ারল্যান্ডের জীবনে Sinead ছিল আমার মাথার ওপর ছায়ার মতো। বিদেশের মাটিতে যখন সবকিছু নতুন, অপরিচিত—তখন কিছু মানুষ নিজের অজান্তেই পরিবারের অংশ হয়ে যায়।
Sinead ছিল তেমনই একজন।
ওকে নিয়ে লিখতে বসলে হয়তো এক হাজার পৃষ্ঠাও কম পড়ে যাবে। তার হাসি, তার রাগ, তার পাগলামি, তার বন্ধুত্ব—সবকিছু মিলিয়ে সে ছিল একটা সম্পূর্ণ গল্প।
আমার একটা ছোট্ট ইচ্ছা আছে।
যদি কোনোদিন লেখক হিসেবে এমন একটা জায়গায় যেতে পারি, যেখানে মানুষ আমার লেখা পড়ার জন্য অপেক্ষা করবে, তখন Sinead-কে নিয়ে একটা বই লিখব।
এখন লিখব না।
কারণ আমি চাই না, Sinead-এর মতো একটা অসাধারণ মানুষ এবং তার গল্প শুধু হাতে গোনা কিছু মানুষের কাছে পৌঁছাক।
আমি চাই, তার গল্প লক্ষ লক্ষ মানুষ জানুক।
মানুষ জানুক—একজন আইরিশ মেয়ে, যে বন্ধুত্বের জন্য লড়াই করতে জানত; যে অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকত না; যে নিজের অজান্তেই একজন প্রবাসী মানুষের জীবনে পরিবারের মতো জায়গা করে নিয়েছিল।
আপনাদের হয়তো একটু মন খারাপ করে দিলাম।
আমারও লিখতে গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল।
তবে জীবন তো শুধু কষ্টের গল্প নয়।
চলুন, শেষ করার আগে আরেকটা ছোট্ট গল্প বলি।
খুব ছোট একটা গল্প।
একজন বৃদ্ধের গল্প।
যেখানে আমি তাকে খুব বড় কোনো শিক্ষা দিতে পারিনি, কিন্তু একটা ছোট্ট উত্তর দিয়েছিলাম—যেটা হয়তো তিনি অনেক দিন মনে রেখেছিলেন।
চলুন, সেই গল্প দিয়েই আজকের লেখা শেষ করি।
আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় আমি একটা এয়ারলাইনে কনট্র্যাকচুয়াল ভিত্তিতে Cabin Crew হিসেবে কাজ করতাম।
একদিন লন্ডন থেকে ফ্লাইট নিয়ে Cork-এ ফিরছি।
যাত্রীদের খাবার, চা-কফি পরিবেশন করছি। হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে একজন বৃদ্ধ যাত্রীর কাছে গেলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— What do you like sir, tea or coffee?
তিনি বললেন,
— Coffee.
আমি আবার জানতে চাইলাম,
— Black or white coffee, sir?
বৃদ্ধ একটু হাসলেন।
তারপর বললেন,
— Coffee like you.
কথাটা শুনেই আমি বুঝতে পারলাম তিনি কী বোঝাতে চাইছেন।
আমি শান্তভাবে বললাম,
— Ok sir.
তারপর তাকে White Coffee দিয়ে দিলাম।
কফির কাপ হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
— What’s this ya handed me? I told ya, coffee like you!
আমি হাসলাম।
তারপর শান্তভাবে বললাম,
— Sir, my complexion is brown, not black. If you notice, the coffee resembles my colour. Thank you very much, and I hope you enjoy your journey. ( স্যার, আমার গায়ের রং কালো নয়, বাদামি। একটু ভালো করে দেখলে বুঝবেন, এই কফির রংটা আমার গায়ের রঙের কাছাকাছি। ধন্যবাদ স্যার। আশা করি আপনার যাত্রা আনন্দময় হবে। )
এরপর আমি খাবারের ট্রে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম।
একবারও পেছনে তাকাইনি।
সত্যি বলতে, খুব ইচ্ছে করছিল ঘুরে দেখি—বৃদ্ধের মুখের অভিব্যক্তি কেমন।
কিন্তু দেখিনি।
কারণ অনেক সময় উত্তর দেওয়ার পর আর পেছনে তাকানোর প্রয়োজন হয় না।
কিছু মানুষকে বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের নয়।
আমাদের দায়িত্ব শুধু নিজের সম্মানটা ধরে রাখা।
লিখতে গিয়ে এই মুহূর্তে একটা কথা মনে পড়ে গেল। লোভ সামলাতে পারলাম না, তাই লিখেই ফেললাম।
এই কথাটা যদি Sinead শুনত, তাহলে বৃদ্ধ সাহেবের নাকের অবস্থা কী হতো, সেটা ভাবতেই আমার মুখে হাসি চলে আসছে। কারণ Sinead অন্যায় বা অপমান খুব সহজে মেনে নেওয়ার মানুষ ছিল না।