প্রথম থেকেই আমার আইটি সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন ছিল। অনেক কষ্ট করে অল্প বেতনের একটি চাকরি পেলাম। যেখানে জয়েন করলাম সেটি ছিল একটি গ্রুপ অব কোম্পানির অধীনে নতুন স্টার্টআপ সফটওয়্যার কোম্পানি। আমরা মাত্র ৫ জন দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। আমার পজিশন ছিল জুনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ।
সফটওয়্যার মার্কেটে আমি পুরোপুরি নতুন, তার ওপর ৯ বছর দেশের বাইরে ছিলাম। যাওয়ার আগে মাত্র ১ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা ছিল বাংলাদেশের মার্কেটে। ফলে আমি ছিলাম একেবারেই এন্ট্রি লেভেলে। বাজারের পরিবেশ বুঝতে বুঝতেই অনেক সময় চলে গেল। ভাগ্য ভালো যে, আমার দুইজন বসের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁদের উৎসাহ আমাকে ভরসা দিয়েছিল—একদিন না একদিন ভালো কিছু হবেই।
আমাদের এমডি আমাকে নিয়ে মার্কেটে যাওয়া শুরু করলেন এবং কিছু মিটিংয়ে বসালেন। ধীরে ধীরে মিটিংয়ের ধাঁচ বুঝতে শুরু করলাম। হঠাৎ করেই কোম্পানিতে ২টি মাঝারি সাইজের প্রোজেক্ট চলে এলো। ভ্যালু প্রায় ৭০ লাখ টাকা। সবাই উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। আমিও ভেতর থেকে আনন্দ পেলাম, শুরু করলাম নতুন উদ্যমে মার্কেটে যাওয়া, মিটিং ফিক্স করা, মিটিং করা এবং সেলস ক্লোজিংয়ে এমডিকে সাথে নেওয়া।
সেই সূত্র ধরে প্রথমবার আমার পরিচয় হলো মিজান ভাইয়ের সাথে। তিনি ছিলেন একটি বড় গ্রুপ অব কোম্পানির আইটি এক্সিকিউটিভ। আমি প্রায়ই তাঁর পেছনে ঘুরতাম, কারণ জানতাম—এখানেই লুকিয়ে আছে বড় সুযোগ। অবশেষে সেটাই সত্যি হলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমরা সেখানে পেলাম একটি বিশাল সেল—২ কোটি টাকার প্রোজেক্ট। আমাদের ছোট্ট কোম্পানিতে তখন যেন আনন্দের ঝড় বয়ে গেল।
প্রোজেক্টের কাজ নিয়ে আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। মিজান ভাইয়ের সাথে একসাথে সার্ভার ইন্সটলেশন, সিস্টেম সেটআপ থেকে শুরু করে নানা কাজে যুক্ত থাকতাম। আসলে আমি কোনো টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ছিলাম না। কিন্তু কোম্পানিতে লোক কম থাকায় টেকনিক্যাল টিমের সহায়তায় সার্ভার ইন্সটলেশন, সফটওয়্যার ইন্সটলেশন, ডেটাবেস কানেকশন—এসব শিখে নিয়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগলো, আর আমি অনেকটা টেকনিক্যাল মানুষের মতোই কাজ করতে শুরু করলাম।
আমি আর মিজান ভাই উৎসাহে ভরপুর হয়ে কাজ চালালাম। ট্রেনিং ম্যাটেরিয়াল তৈরি, ইমপ্লিমেন্টেশনের রোডম্যাপ সাজানো—সব কিছুতে আমরা ডুবে গেলাম। সময়মতো ইমপ্লিমেন্টেশন শুরু হলো। ইমপ্লিমেন্টেশন টিম আমার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো, আর আমি ছুটে চললাম নতুন প্রোজেক্টের খোঁজে।
ইমপ্লিমেন্টেশনের কাজ যখন পুরোদমে চলছে, ঠিক তখনই হঠাৎ এক খবর এলো—মিজান ভাইয়ের কোম্পানিতে ইন্টারনাল সমস্যার কারণে কাজ আপাতত বন্ধ থাকবে। আমি হতবাক। ইতিমধ্যেই তারা আমাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছে, তারপরও কেন হঠাৎ সব থেমে গেল?
আমি তখন ঝাঁপিয়ে পড়লাম কারণ খুঁজতে। একের পর এক খোঁজ নিলাম, কিন্তু স্পষ্ট উত্তর কেউ দিচ্ছিল না। অবশেষে আসল কারণটা সামনে এলো—কোম্পানির কিছু ইউজারই চাইছিল না এই সফটওয়্যার ইমপ্লিমেন্ট হোক। তারা নানাভাবে বাধা দিচ্ছিল। ম্যানেজমেন্ট প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল তাদের রাজি করাতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো।
এভাবেই হঠাৎ থেমে গেল পুরো প্রোজেক্ট। সবকিছু জমে গেল নিস্তব্ধতায়। আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই ধীরে ধীরে মিজান ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগও ফিকে হয়ে এলো…
মাসে একবার, কখনো বা দুইবার মিজান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখতাম। কিন্তু হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল—মিজান ভাই এর ফোন বন্ধ পাচ্ছি । ওপাশে কোনো সাড়া নেই। অদ্ভুত লাগছিল। আমাদের এত ভালো সম্পর্ক, হঠাৎ কেন এভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন?
মনের অস্বস্তি বেড়ে গেল। উত্তর খুঁজতে আমি ফোন দিলাম রফিক ভাইকে, যিনি মিজান ভাইয়ের বস। শুধু খোঁজখবর নেয়ার জন্য। রফিক ভাই একটু থেমে মৃদু কণ্ঠে বললেন—“মিজান ভাইয়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। এখন আর অফিসে তেমন আসেন না, প্রায়ই ডাক্তারদের কাছে যেতে হয়।”
কথাটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। যেন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধু একটা প্রশ্ন করতে পারলাম—
“ভাই, তাঁর অন্য কোনো নাম্বার আছে কি না?”
রফিক ভাই আমাকে মিজান ভাইয়ের আরেকটা নাম্বার দিলেন। আমি সেই নাম্বারে ফোন দিলাম। মিজান ভাই ফোন ধরে আমাকে সালাম দিলেন। সালাম শুনে আমি উত্তর দিলাম কিন্তু গলা শুনে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম—তিনি আসলেই মিজান ভাই কিনা।
কথায় কথায় জানতে পারলাম, তিনি এখন পান্থপথের একটি হাসপাতালে এসেছেন ডাক্তার দেখানোর জন্য। আমি বললাম—
“ভাই, আমি আসছি ৩০ মিনিটের মধ্যে। আপনি ডাক্তার দেখাতে দেখাতে, আমি পৌঁছে যাবো।”
মিজান ভাই উত্তর দিলেন—
“ভাই, খামাখা কষ্ট করবেন কেন? তাও আসেন, আপনার সাথে অনেক দিন দেখা হয়নি।”
আমি প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছে গেলাম। দেখলাম মিজান ভাই ডাক্তার ডাকবেন বলে অপেক্ষা করছেন। আরেকজন রুগী শেষ হলে উনি ভেতরে যাবেন। তাঁর সাথে ছোট ভাইও এসেছিলেন।
আমাকে দেখে মিজান ভাই জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন—
“ভাই, কেমন আছেন? অনেক দিন পর দেখা , আর মনে হয় অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে একসাথে চা খাওয়া হবে না। খুব মিস করি সেই দিনগুলো।”
আমি হেসে উত্তর দিলাম—
“ভাই, টেনশন নেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে, আল্লাহ ভরসা।”
আমি আর মিজান ভাই স্বাভাবিক ভাবেই গল্প করছিলাম, এর মধ্যেই ডাক্তারের ডাক পড়লো। মিজান ভাই ডাক্তারের রুমে ঢুকছিলেন। হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকিয়ে বললেন—
“ভাই, আপনিও আসেন ডাক্তারের রুমে। উনার কথা শুনলে আমার ভাই খালি কান্নাকাটি করে, আর ওর কান্না শুনে আমার ভয় লাগে। আপনার সময় থাকলে, প্লিজ আপনিও আসেন।”
মিজান ভাইয়ের করুণ অনুরোধে আমি তাঁর সাথে ডাক্তারের রুমে ঢুকলাম। ঢুকেই অবাক হলাম—যে ডাক্তার তাঁর চিকিৎসা করছিলেন, তিনি আসলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধুর মামা। (এই মামাই আমার আব্বার ক্যান্সারের চিকিৎসা করে পুরোপুরি সুস্থ করেছিলেন।) আমি তাঁর পুরো নামে চিনতাম না, শুধু ডাকনাম চিনতাম। উনি এত বড় ডাক্তার, সেটাও জানতাম না।
মামা আমাকে দেখে বললেন—
“আরে সুমন, তুমি! রোগী তোমার কে হয় ?”
আমি উত্তর দিলাম—
“মামা, আমি ভাবতেও পারিনি আপনাকে এখানে পাবো। আর আপনি যে ক্যান্সার স্পেশালিস্ট, সেটাও জানতাম না। উনি আমার সহকর্মী।”
মামা বললেন—
“উনি (মিজান ভাই) এখন কিছুটা ভালো আছেন। অপেক্ষা করতে হবে। সুস্থও হয়ে যেতে পারেন। আপাতত কেমো ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আগের থেকে বেশ ভালো।”
এই সময় মিজান ভাইয়ের ছোট ভাই কান্না শুরু করলেন। মামা বিরক্ত হয়ে মিজান ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন— “উনি আপনার কে হন?”
মিজান ভাই উত্তর দিলেন—
“আমার ছোট ভাই।”
মামা মিজান ভাই ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে, কিছুটা ধমকের সুরে বললেন—
“আমি বললাম উনি এখন ভালো আছেন, তাহলে এভাবে কান্নাকাটি কেন? যখনই আসেন, তখনই কান্নাকাটি শুরু করে। আপনার সমস্যা কোথায়? পরের বার আপনি আর আসবেন না । আবারও বলছি, উনি আগের থেকে ভালো আছেন। অপেক্ষা করেন , হয়তো সুস্থ হয়ে যেতে পারেন।”
আমি মিজান ভাইকে বললাম— “ভাই, আপনি আপনার ছোট ভাইকে নিয়ে বাইরে বসুন। আমি মামার সাথে একটু কথা বলি।”
তাঁরা বাইরে গেলেন। আমি মামাকে জিজ্ঞেস করলাম— “আসলে উনি কেমন আছেন?”
মামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— “ভালো না। শেষ সময়ে ধরা পড়েছে। আর কিছু করার নেই। ধীরে ধীরে বিছানায় পড়ে যাবে।”
তিনি আরও বললেন— “এই বিষয়টা তাঁর ছোট ভাই জানে। প্রথম দিনই আমি বলে দিয়েছি।”
আমি বললাম— “ওও আচ্ছা এই কারণেই বোধহয় উনি বারবার কান্না করেন।” (আসলে মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের কান্না দেখে আমিও কিছু তা বিরক্ত হয়েছিলাম।)
মামা বললেন— “হতে পারে। তবে তোমার সাথে যদি ভালো সম্পর্ক থাকে, তাহলে তাদের শক্ত হতে বলো। আসলে কিছু করার নেই।”
এরপর মামার সাথে কিছু অন্য কথা হলো, যেগুলো মিজান ভাই সম্পর্কিত না। শেষে আমি বিষণ্ণ মুখে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম।
বাইরে এসে দেখি, মিজান ভাইয়ের ছোট ভাই কাঁদছেন। এবার আর বিরক্ত লাগলো না। বুঝলাম, তাঁর কাছে মিজান ভাই বাবার মতো। তাই বারবার ডাকছিলেন—
“বড় ভাই, বড় ভাই।”
আমরা কিছুক্ষণ ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে থাকলাম। মিজান ভাইয়ের সাথে গল্প করছিলাম, কিন্তু তিনি আর আগের মতো ছিলেন না। কিছুক্ষণ হাঁটলে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, আস্তে আস্তে কথা বলতেন। বোঝা যাচ্ছিল, কথা বলতেই তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।
অবশেষে তাঁর জন্য সিএনজি ঠিক করে দিয়ে আমি বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
মাঝে মাঝে আমি মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে খবর নিতাম। তাঁকে খুব কম ফোন দিতাম—
ফোন দিলেও এক মিনিটের বেশি কথা বলতাম না। কারণ এস্পস্টই বুঝা যেত মিজান ভাইয়ের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ।
একদিন হঠাৎ মামার ফোন এলো। গম্ভীর গলায় বললেন— “তোমার ওই রোগী আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।”
শুনে বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো। আমি জবাব দিলাম—
“ও আচ্ছা… দেখতে যাবো।”
কিন্তু মনে অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করলো। মনে হচ্ছিল, এই খবরটা মামার মুখে নয়—মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের মুখেই শোনা উচিত ছিল। জানি না কেন, এই নিয়ে এক ধরনের অভিমান জমে গেল মনে।
সেদিন সন্ধ্যায়ই ফোন এলো ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে। কণ্ঠটা ক্লান্ত, তবুও বিনয়ী—
“ভাইয়া, বড় ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। স্যরি ভাইয়া, আপনাকে খবরটা দিতে দেরি হয়ে গেছে, অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছিল।”
ফোনের ওপাশ থেকে তাঁর কণ্ঠ শুনেই অভিমান চলে গেল। কেবিন নাম্বার নিলাম। তবে সেদিন আর যাওয়া হলো না। পরদিন সন্ধ্যায় অফিসের কাজ শেষ করে ছুটে গেলাম মিজান ভাইকে দেখতে।
কেবিনে ঢুকতেই চমকে গেলাম। এ কি সেই মানুষ? মিজান ভাইকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। মুখে উজ্জ্বল আলো, একফালি বিশাল হাসি।
“ভাই, আসেন আসেন। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি খবর পাননি। ভাবছিলাম আপনাকে ফোন দেবো।”
আমি হেসে উত্তর দিলাম— “না ভাই, খবর পেয়েছিলাম কালই। নারায়ণগঞ্জে ছিলাম, ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো , তাই আসা হয়নি। এখন কেমন আছেন?”
তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন— “আছি ভাই, ভালোই আছি। গতকাল হঠাৎ অবস্থাটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তাই ভর্তি হয়েছি। আপনার মামা এসেছিলেন, আপনার কথাই জিজ্ঞেস করলেন।”
কথা ঘুরলো ধীরে ধীরে সফটওয়্যারের প্রসঙ্গে। তিনি হতাশ কণ্ঠে বললেন— “আমাদের কোম্পানিতে তো হলো না ভাই, কিছু ইউজারের কারণে। তবে আমি যদি সুস্থ হই, আবার এমডি স্যারের কাছে যাবো। এ বার শেষ দেখে ছাড়বো।”
আমি আশ্বস্ত করলাম—“ভাই, আমি আছি আপনার পাশে।”
তারপর হঠাৎ পরিবার প্রসঙ্গে চলে গেলেন। চোখের কোণে বিষণ্ণতা নিয়ে বললেন—
“ভাই, অনেক চিন্তায় ছিলাম । আমার ছেলে, তার বয়স মাত্র ২ বছর। আমার স্ত্রী তো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। যাই হোক, আপনার মামা বলেছেন মোটামুটি সব ঠিক আছে, সুস্থ হয়ে উঠবো।”
এই প্রথম শুনলাম তাঁর ছেলের কথা। বুকটা হু-হু করে উঠল। এত কম বয়সে একজন পিতা, আর সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ!
এরপর আরও গভীর কণ্ঠে বললেন—
“ভাই, আপনার উচিত স্মোকিং ছেড়ে দেওয়া। আমার বাবাও ক্যান্সারে মারা গেছেন—আমার চোখের সামনে। আমার ক্যান্সার ধরা পড়ার পর আমি ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। পরে ভয় কেটে গেছে, কিন্তু আমার ছোট ভাইটা আমাকে অস্বাভাবিক ভালোবাসে। ওর কাছে আমি বাবার মতো। ওর বয়স ছিল মাত্র ৫ যখন বাবা মারা যায়। আমার ১৭। বাবা কিছুই রেখে যাননি, যার কারণে আমাকে সংসারের অনেক দায়িত্ব নিতে হয়েছে। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি ভাই। বাবা না থাকার মানে হলো জীবনটাই অন্ধকার।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার হেসে বললেন— “আজকে আপনাকে দেখে খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে বাইরে গিয়ে এক কাপ চা খাই, একটা সিগারেটও টানি।”
আমি হেসে থামালাম— “না ভাই, এখন না। স্যালাইন চলছে। সুস্থ হয়ে নিন, ইনশাআল্লাহ, সেই দিন আসবে।”
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন— “হ্যাঁ ভাই, আবার আড্ডা হবেই।”
আমাদের গল্প ভালোই জমে উঠেছিল, ঠিক তখনই তাঁর স্ত্রী আর ছোট্ট ছেলেটি কেবিনে ঢুকলো। বাচ্চাটাকে আদর করে আমি বিদায় নিলাম। কেবিন থেকে বের হতেই দেখলাম—ছোট ভাই আগের মতোই ফুঁপিয়ে কাঁদছে…
আমি ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম— “ডাক্তার কী বলেছেন?”
তিনি ভাঙা গলায় উত্তর দিলেন— “ভাইয়া, ডাক্তারের কাছে যাইনি। ডাক্তারের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না।”
আমি বুঝলাম, উনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। এরপর তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মামার চেম্বারে গেলাম। গিয়ে দেখি মামা নেই, হাসপাতালে রাউন্ড দিচ্ছেন। আমি তাঁকে ফোন দিলাম। মামা জানালেন, একটু অপেক্ষা করতে, তিনি ১০ মিনিটের মধ্যে আসবেন।
কিন্তু আসলেন ৩৮ মিনিট পরে। আসলে মামার সময় জ্ঞান আগের থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে—এটা ভেবে হাসি পেল। মামার সময়জ্ঞান নিয়ে অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে, তবে ওটা মিজান ভাইয়ের প্রসঙ্গ নয়, তাই মামার সময়জ্ঞান নিয়ে আলাদা করে আর লিখলাম না ।
মামা আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন—
“একটু ওয়েট করো। আজকে রোগীর চাপ কম, মাত্র ২ জন আছে। ওদের দেখে আমরা বাইরে ডিনার করবো।”
কথাটা শুনে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। মামা রোগী দেখা শেষ করলেন, আমরা বাইরে বের হয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম। আড্ডার ফাঁকেই আমি মিজান ভাইয়ের কথা তুললাম। বললাম—
“আজকে তাঁকে বেশ ঝরঝরা লাগলো। কথা বলতেও খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না। অনেক কথা বললেন আমার সাথে।”
মামার মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বললেন—
“হ্যাঁ, আজকে কিছুটা ভালো আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, তাঁর অবস্থা ভালো না। প্রায় শেষের দিকে।”
আমার বুক কেঁপে উঠলো। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে ফেললাম—
“মামা, কতদিনের মতো বাঁচবেন?”
মামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন—
“দেখো, বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে। তবে আমাদের হিসাবে খুব বেশি দিন নেই। আমি কোনোদিনই কোনো টাইমলাইন দিইনি, এখনো দেবো না। টাইমলাইন দেওয়া আমার পছন্দ নয়।”
কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম—মামা এই বিষয়ে আর কিছু বলতে চান না। আমরা কথা ঘুরিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বেজে গেল। পরের দিন অফিসে যেতে হবে তাই ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে গেলাম।
অফিসে গিয়ে মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইকে ফোন দিলাম খবর নেয়ার জন্য। তিনি জানালেন—আজকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে এবং তারা মিজান ভাইকে নিয়ে বাসায় চলে যাবেন।
২ থেকে ৩ দিন পরপর আমি মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে তাঁর খোঁজ নিতাম। মাঝেমাঝে মিজান ভাইকেও কল দেওয়া হতো। এইভাবেই চলছিল।
তারও কিছুদিন পর গভীর রাতে মিজান ভাইয়ের ছোট ভাই ফোন দিলেন। তাঁর ফোন দেখে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। ফোন রিসিভ করে জানতে পারলাম—মিজান ভাইয়ের শরীর খারাপ এবং তিনি আমার সাথে দেখা করতে চাইছেন।
আমি বললাম—সকালে আমার একটা জরুরি মিটিং আছে, মিটিং শেষ করে আমি হাসপাতালে যাবো।
সকালে মিটিং-এ গেলাম এবং মামাকে ফোন দিলাম। কিন্তু কোনো কারণে মামা ফোন রিসিভ করলেন না। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম মিটিং-এ। সফটওয়্যারের প্রেজেন্টেশন ছিল, সেই প্রেজেন্টেশন শেষ করতে করতে রাত প্রায় ৮টা বেজে গেল। ভালুকায় একটি ফ্যাক্টরিতে প্রেজেন্টেশন ছিল।
প্রেজেন্টেশন শেষ করে মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইকে কল দিলাম এবং জানালাম—আজকে যেতে পারবো না, কালকে যাবো। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ২টা বেজে গেল। সকালে ঠিক করলাম অফিসে গিয়ে প্রপোজালটা পাঠিয়ে তারপর মিজান ভাইকে দেখতে যাবো। আমিও মিজান ভাইকে দেখার জন্য ছটফট করছিলাম, কারণ উনি আমার সাথে দেখা করতে চাইছিলেন।
গতকাল প্রেজেন্টেশন শেষ করে অনেক রাতে বাসায় ফিরেছিলাম , তাই অফিসে গেলাম অনেক দেরি করে ,অফিসে গিয়ে প্রপোজাল সেন্ড করার পর অনেকবার রিভাইজ করতে হলো। প্রপোজাল শেষ করতে করতে প্রায় ৩টা বেজে গেল। আমি অফিস থেকে বের হলাম, রওনা দিলাম হাসপাতালের দিকে। মাত্রই সিএনজিতে উঠেছি, সঙ্গে সঙ্গে মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের ফোন। আমি রিসিভ করতেই তাঁর কান্নাকাটি শুনে বুঝে ফেললাম—মিজান ভাই আর নেই।
আমি স্বার্থপরের মতো ফোনটা কেটে দিলাম। বেলালকে (আমার পরিচিত সিএনজি ড্রাইভার) বললাম বাসায় ফিরে যাবার জন্য । আমি আর হাসপাতালে গেলাম না।
আমি চাইনি আর মিজান ভাইয়ের সামনে দাঁড়াতে, কারণ উনি আমাকে ডেকেছিলেন , আর আমি যেতে পারিনি। সেই অপরাধ বোধটা এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। ওই কথাগুলো মনে পড়লে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়। নিজে নিজে অনেকবার ভেবেছি—কি বলতে চেয়েছিলেন মিজান ভাই আমাকে?
একবার ভেবেছিলাম, মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করবো—তিনি কিছু বলেছিলেন কি না আমার সম্পর্কে। কিন্তু আমি ফোন দিইনি মিজান ভাইয়ের ছোট ভাইকে। মিজান ভাই আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছিলেন, আমি নিশ্চিত—তিনি তাঁর পরিবারে আমাকেও বড় করে রেখেছিলেন। কিন্তু আমি সেই সম্মান রাখতে পারিনি।
মিজান ভাই চলে যাওয়ার ছয়-সাত মাস পর তাঁদের কোম্পানি থেকে হঠাৎ ফোন এলো—
“আমরা আবার ইমপ্লিমেন্টেশন শুরু করতে চাই।”
এক অদ্ভুত শূন্যতা ভরে গেল বুকের ভেতর। আমি ইমপ্লিমেন্টেশন টিম পাঠিয়ে দিলাম। কাজ শুরু হলো, আর সেই কাজ নিখুঁতভাবে শেষও হলো। তারপর থেকে আর থামেনি। প্রায় ৮ বছর হয়ে গেছে—আজও ওই কোম্পানি আমাদের সফটওয়্যার ব্যবহার করছে।
ওই কোম্পানির MIS টিমের পুরনো সবাই এখনো আছে। শুধু একজন নেই—মিজান ভাই। তিনি চলে গেছেন এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না।
মাঝে মাঝে এখনো তাঁদের অফিসে যাওয়া হয়। অফিস থেকে বের হয়ে আসার পরও মনে হয়—হয়তো মিজান ভাই আসবেন, হাসিমুখে বলবেন,
“ভাই, চলেন নিচে যাই।”
আগে যখনই যেতাম, অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে আমরা গল্প করতাম। একসাথে চা খেতাম, সিগারেট টানতাম। কিন্তু এখন… মিজান ভাই নেই। তাই মিটিং শেষ করেই নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে চলে আসি তাঁদের অফিস থেকে। হৃদয়ের ভেতরটায় তখন শুধু শূন্যতা বাজতে থাকে।
মিজান ভাই আজও আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন। নামটা রয়ে গেছে, প্রোফাইলটা রয়ে গেছে, যেন তিনি এখনো কোথাও বেঁচে আছেন।
তিন বছর আগে আমি তাঁকে একটি মেসেজ দিয়েছিলাম। ছোট্ট এক লাইন—
“ভাই, কেমন আছেন? আপনাদের কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইমপ্লিমেন্টেশন শেষ।”
আজও সেই মেসেজ পড়ে আছে ‘Seen’ হয়নি।
মনে হয়—আমার ওপর তাঁর প্রচণ্ড অভিমান রয়ে গেছে। হয়তো সেই শেষ সময়ে আমি তাঁকে দেখা করতে যাইনি বলেই।
মিজান ভাই মারা যাওয়ার কিছুদিন পর রফিক ভাই আমাকে ফোন দিয়েছিলেন— “চল্লিশায় আসবেন।”
কিন্তু আমি যেতে পারিনি। তখন মামা শ্বশুরের বিয়ের আয়োজন আর কথাবার্তা চলছিল। বাধ্য হয়ে সেখানে অংশ নিতে হলো। সেই অনুষ্ঠানেই প্রথমবার দেখলাম আগত নতুন মামিকে।
আহামরি সুন্দর না… কিন্তু হাসিটা ছিল সত্যিই অপূর্ব।