বয়স নির্দেশনা
উপন্যাসে কিছু সংবেদনশীল ও মানসিকভাবে তীব্র বিষয় থাকায় বইটি ১৬ বছরের নিচের পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়।
হুড়মুড় করে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসল শামসু। এই শীতের ভোরেও তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। বুকটা ধকধক করছে, যেন এখনো দৌড়াচ্ছে। বিছানায় বসা অবস্থায়ই বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করল। সময়—৫টা ১১ মিনিট ০৪ সেকেন্ড।
অনেকে শুধু ঘণ্টা আর মিনিট দেখে। শামসু সেকেন্ডও দেখে। কেন দেখে, সে নিজেও ঠিক জানে না। তবে তার মনে হয়, সময়টা পুরোটা জানা দরকার। আজ এত ভোরে তার ঘুম ভাঙার কারণ একটা দুঃস্বপ্ন।
সে দেখেছে—একটা উঁচু বিল্ডিংয়ের গায়ে ঝুলে রংয়ের কাজ করছে। হঠাৎ দড়ি ছিঁড়ে গেছে। তারপর সে পড়ছে… শুধু পড়ছে। সময়টা দেখেই সে একটু বেশি ঘাবড়ে গেল। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল—সকালের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। শামসু ধীরে ধীরে কয়েকবার আল্লাহর নাম নিল। গলার শব্দ যেন বের না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখল।
তারপর মনে মনে ঠিক করল—
আজ আর ঘুমাবে না। পাশ ফিরে তাকাল। তার মেয়ে মুনিয়া ঘুমিয়ে আছে। একদম নিশ্চিন্ত ঘুম। মুনিয়ার পাশে বিলকিস বেগম। ওদের ঘুম না ভাঙে, এই ভেবে খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামল শামসু। পা টিপে টিপে দরজার দিকে গেল, তারপর আস্তে করে বাইরে বের হলো।
ঘর থেকে বের হয়ে চারপাশে তাকাল। এখনো কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি।আশেপাশের রুমগুলোর দরজা বন্ধ। মোহাম্মদপুরের একটা টিনশেড বাসা। মোট ছয়টা রুম। তারই একটায় থাকে শামসু—তার ছোট্ট পরিবার নিয়ে।
এই বাসার বেশিরভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের। সকাল থেকে রাত—কাজ আর কাজ।
শামসুও তাদেরই একজন। চাইলেই সে একটু ভালো জায়গায় থাকতে পারত। কিন্তু সে সেটা করে না। তার মাথায় সবসময় একটাই চিন্তা—মেয়ে মুনিয়ার ভবিষ্যৎ। তাই যতটা পারে টাকা জমায়।
তার ওপর এই এলাকায় সে অনেকদিন ধরে আছে। মানুষজন তাকে চেনে। আপন করে নিয়েছে। কোনো বিপদে শামসু যেমন সবার পাশে দাঁড়ায়, তেমনি ওরাও তার পাশে দাঁড়ায়। এই ভরসাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড়।
মেয়ে মুনিয়া এখন ক্লাস ২-এ পড়ে। ছোট ছোট কথা বলে, কিন্তু সেই কথার মধ্যেই একটা আলাদা জোর আছে। এই বয়সেই সে শামসুকে শাসন করে। আর এই শাসনটাই শামসুর সবচেয়ে ভালো লাগে।
মুনিয়ার কথা শুনে শামসু মাঝে মাঝে হেসে ফেলে। তারপর বিলকিসকে বলে—
“বুজলি বউ, আমার মাইয়া এই দেশের বড় পুলিশ অফিসার হইবো। সন্ত্রাসীরা আমার মাইয়ার ভয়ে কাপাকাপি করবো। কী কস বউ, ঠিক কইসি না?”
শামসুর কথা শুনে বিলকিস বেগম মিটমিট করে হাসে। সেই হাসির মধ্যে একটা শান্তি আছে। তারও মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের জন্যই দিন-রাত খেটে যাচ্ছে তারা দু’জন।
শামসু যেমন মুখে মুখে বলে—
যত কষ্টই হোক, মুনিয়াকে লেখাপড়া করাবে, মানুষ করবে। বিলকিসও একই কথা ভাবে, তবে সে চুপচাপ নিজের মনে প্রতিজ্ঞা করে রাখে। এই জায়গাটাতেই তাদের পার্থক্য—
শামসু জোরে বলে, বিলকিস মনে রাখে।
সময় তখন সকাল ৭টা ০২ মিনিট ১১ সেকেন্ড।
শীতের সকাল। ঢাকায় শীত খুব বেশি না পড়লেও আজ একটু বেশি লাগছে। তার ওপর ঘন কুয়াশা। দশ-বারো হাত দূরের জিনিসও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। ডিসেম্বরের দিকে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না, এই সময় অনেক স্কুলও বন্ধ থাকে। রাস্তায় মানুষের ভিড় কম। যে কয়েকটা গাড়ি চলছে, তারা হেডলাইট জ্বালিয়ে চলছে কুয়াশার কারণে।
শামসু গায়ে ভালো করে জামা-কাপড় চাপিয়ে বের হয়েছে। তার গন্তব্য জাপান গার্ডেন সিটি। সেখান থেকে বাস ধরবে বনানীর কাকলির মোড় পর্যন্ত। তারপর সেখান থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট হেঁটে যাবে গুলশান ২ নম্বরের একটা কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের কাছে।
পেশায় সে একজন রং মিস্ত্রি। আজ ১৩ তলা বিল্ডিংয়ের বাইরের অংশে তার কাজ শুরু করার কথা। আগের দিন সে ঠিকঠাক করে রশিগুলো ঝুলিয়ে রেখে এসেছে। আজ সেই রশিতে ভর করেই কাজ শুরু করবে।
শামসু মিয়ার অনেক আগে থেকেই উচ্চতার ভয় আছে। উঁচু জায়গায় উঠলেই তার বুক ধড়ফড় করে। তারপরও সে এই ঝুঁকির কাজগুলো করে। করার একটাই কারণ—মেয়ে মুনিয়ার ভবিষ্যৎ। এই কাজ ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু টাকাটা একটু বেশি পাওয়া যায়।
শামসু মিয়ার মোবাইলের ঘড়ির সময় অনুযায়ী সকাল ৮টা ৪৭ মিনিট ১২ সেকেন্ডে সে গুলশান ২-এর কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। ছাদের ওপর আগে থেকেই রহমত, বেলাল, হাতেম ছাড়াও আরও তিনজন দাঁড়িয়ে আছে। তারা শামসুর আগেই এসেছে এবং সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে। রংগুলো খুব দামি, একটু এদিক-ওদিক হয়ে গেলেই সমস্যা। তাই তারা নিজেরা মিশ্রণ শুরু করার সাহস পায়নি।
এখনকার দিনে বাজারে ফাইনাল মিক্সিং রং পাওয়া যায়। বিভিন্ন কোম্পানির কাছে এমন রং আছে, যেগুলো মেশিনে সহজেই মিশিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু এই বাড়ির মালিক সেই পথে যেতে রাজি না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন,
“শুনো, আমি ওই মেশিনে মিক্সিং করা রংয়ে বিশ্বাস করি না। তোমরা নিজেরা রং মিশাইবা। আমি যে রং চাই, সেই রং বানাইয়া কাজ করবা।”
আরও বলেছেন,
“যদি রং নষ্ট করো, তাহলে তোমাদের মজুরি থেকে টাকা কাটা হবে।”
এই কথাগুলো শোনার পর থেকেই কেউ আর ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই সবাই অপেক্ষা করছিল শামসুর জন্য। শামসু এসে রহমতদের সঙ্গে যোগ দিল। হাতেম আর রহমত মাপ অনুযায়ী রং ধরছে, আর শামসু সেই মাপ অনুযায়ী রং ঢেলে দিচ্ছে। তারা ধীরে ধীরে রং নাড়িয়ে একটা আধুনিক ধাঁচের অ্যাশ রং তৈরি করছে, যেখানে সাদা, কালো আর হালকা নীল রং মিশ্রণ আছে।
রঙের মিশ্রণ শেষ হলেই তারা দড়িতে ঝুলে পড়বে কাজের জন্য। আজকের পরিকল্পনা অনুযায়ী চারজনের একটি টিম দড়িতে ঝুলে রং করবে। তাদের মধ্যে শামসু নিজেও থাকবে। তার বাম পাশে থাকবে বেলাল, ডান পাশে থাকবে হাতেম, আর হাতেমের ডান পাশে থাকবে কবির।
আকাশ এখনো কুয়াশায় ঢাকা। এতটাই কুয়াশা যে মাঝে মাঝে কাছের জিনিসও ঠিকমতো দেখা যায় না। গুলশান এলাকায় গাছগাছালি বেশি থাকার কারণে কুয়াশাও একটু বেশি লাগে। এত শীতের মধ্যেও পাখির কিচিরমিচির থামেনি। শামসু গ্রামের ছেলে, এই শব্দ তার খুব পরিচিত। গ্রামে থাকলে এই শব্দ তার ভালো লাগত। কিন্তু ঢাকা শহরে একই শব্দ তার ভালো লাগে না। কেন লাগে না, সেটা সে নিজেও ঠিক বলতে পারে না।
মোবাইলটা বের করে সময় দেখল শামসু। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট। অভ্যাস মতো সেকেন্ডও দেখল। সেখানে দেখাচ্ছে ১০ সেকেন্ড। মানে ৯টা ৩৭ মিনিট ১০ সেকেন্ড। সময়টা দেখেই সে রহমত আর হাতেমকে তাড়া দিল—কাজটা দ্রুত শেষ করার জন্য।
এমনিতেই রংয়ের কন্ট্রাক্টর বলে দিয়েছে, বাইরের কাজ শেষ করতে হবে ১২দিনের মধ্যে। লোক বাড়াতে হলে বাড়াতে হবে, কিন্তু সময় বাড়ানো যাবে না। এত বড় একটা বিল্ডিংয়ের বাইরের রং করতে সাধারণত ১৭ থেকে ২০ দিন লাগে। ১২ দিনে শেষ করতে হলে লোক বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই—এই কথাটা কন্ট্রাক্টর আগেই বলে দিয়েছে।
কিন্তু শামসু মিয়ারা হিসাবটা অন্যভাবে করেছে। লোক বাড়ালে টাকা ভাগ হয়ে যাবে। তাই তারা ঠিক করেছে, আগের লোক দিয়েই একটু বেশি চাপ নিয়ে কাজ করবে। কষ্ট হবে, কিন্তু যদি ১২ দিনের মধ্যে শেষ করা যায়, তাহলে লাভটা তাদেরই থাকবে। রঙের মিশ্রণ প্রায় শেষ। শামসু আর বাকিরা প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবাই নিজেদের সেফটি বেল্ট পরে নিচ্ছে।
রাতের কুয়াশায় দড়িগুলো ভিজে গেছে। ছুঁলেই বোঝা যায়—সেঁতসেঁতে ভাব। বাঁশগুলোও পিচ্ছিল হয়ে আছে। হাত শক্ত করে ধরতে হচ্ছে। এমন ঠান্ডা যে আঙুলে একটু জড়তা চলে আসে। নিঃশ্বাস ছাড়লেই হালকা ধোঁয়ার মতো দেখা যায়।
তাই সবাই সাবধানে দড়িতে নামছে।
কেউ তাড়াহুড়া করছে না।
সূর্যের দেখা এখনো পাওয়া যায়নি। কুয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। বেলা প্রায় ১০টার দিকে, সবাই নিজের নিজের রঙের ড্রাম নিয়ে একে একে ঝুলে পড়ল ১৩ তলা বিল্ডিংয়ের বাইরের দিকে। বাইরের দেয়ালগুলোও হালকা ভেজা। কুয়াশার জন্য একটা সেঁতসেঁতে ভাব আছে। আগে হলে এই অবস্থায় রং করা ঠিক হতো না। রং ঠিকমতো বসত না। কিন্তু এখনকার রং আলাদা। এই সেঁতসেঁতে দেয়ালেও কাজ চলে। শামসু মিয়া এসব নিয়ে বেশি ভাবল না। সে শুধু বলল,
“চল মিয়ারা , শুরু করি।”
তারপর নিজেই ব্রাশে রং নিয়ে দেয়ালে টান দিল।
ধীরে ধীরে বাকিরাও শুরু করে দিল।
কাজ এগোচ্ছে ভালোভাবেই। মাঝেমধ্যে হাত থামিয়ে একটু কথা, আবার কাজ—এইভাবেই চলছে। বেলাল গুনগুন করে গান ধরেছে। খুব জোরে না, নিজের মতো করে। শামসু আর হাতেম কথা বলছে। কবির চুপচাপ, একমনে কাজ করছে।
শামসু হাতেমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিও, হাতেম, তোমার পোলার খবর কী? এইবার কোন ক্লাসে উঠবো?”
“পোলা ভালো আছে। এইবার ক্লাস ফোরে উঠবো।”
শামসু মাথা নেড়ে বলল,
“ভালো ভালো, পোলাটারে পড়াশোনা করাইও।”
হাতেম হালকা হাসল।
“জি ভাই, ইচ্ছা তো আছে। বাকি আল্লাহ ভরসা।”
“হ, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, আর মন দিয়া কাম করো।”
“জি ভাই, দোয়া রাখবেন। আপনার মাইয়ার খবর কী?” হাতেম জিজ্ঞেস করল।
“আছে, ভালো আছে,” শামসু বলল।
“এইবার কোন ক্লাসে উঠবো?”
“এইবার ক্লাস থ্রিতে উঠবো।”
হাতেম একটু হেসে বলল,
“আল্লাহ, মাইয়া দেখি আপনার বড় হইয়া গেসে।”
শামসু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“হ মিয়া, মাইয়া দেখতে দেখতে বড় হইয়া যাইতাসে।”
হাতেম আবার মজা করে বলল,
“আর কিছুদিন পর তো আপনি শশুর হইয়া যাইবেন।”
শামসু একটু হেসে আবার সিরিয়াস হয়ে বলল ।
“ধুর মিয়া, কি কও! আমি আমার মাইয়ারে অনেক পড়ামু। আমি না পারলেও, আমার মাইয়া অনেক দূর যাইবো। বুঝলা হাতেম মিয়া।”
হাতেম মাথা নেড়ে বলল,
“জি ভাই, বুজলাম। আল্লাহ আপনার এই ইচ্ছা পূরণ করুক।”
শামসু আস্তে করে বলল, “আমিন।”
শামসু হঠাৎ বেলালকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ওই বেলাল, কী গান গাস? একটু জোরে গা!”
শামসুর কথা শুনে বেলাল গলার আওয়াজ একটু বাড়াল।
“ও নদীর কূলে বসে আছি, তুই কবে আসবি রে…”
হাতেমের পাশে কাজ করতে থাকা কবির মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ওই ব্যাটা, কী গাস? সিনেমার গান ধর, গা গরম করা গান ধর। কীসব ধুন-ফুন গান করস!”
কবিরের কথা শুনে হাতেম আর শামসু হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই হাতেম বলল,
“বেলাল রে, ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়, এ মন শুধু তোমাকেই চায়…’ ওই গানটা ধর।”
বেলাল একটু গলা পরিষ্কার করে সুর ধরে গান শুরু করল—
“ও প্রিয়া তুমি কোথায়, এ মন শুধু তোমাকেই চায়…
নিশীথ রাত জেগে থাকি, তোমারই অপেক্ষায়…”
ঘন কুয়াশার ভেতরেও গানের সুর ভেসে যাচ্ছে। পাখির কিচিরমিচিরের সঙ্গে মিশে একটা অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কেউ জোরে গাইছে না, কিন্তু সবাই নিজের মতো করে গুনগুন করছে।
কাজ থেমে নেই।
রঙের ব্রাশ একটার পর একটা দেয়ালে পড়ছে।
বেলাল গান গাইছে, আর বাকিরা কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে খুনসুটি করছে। এভাবে কাজ করতে করতে তারা ১৩ তলা থেকে আস্তে আস্তে ১২ তলার দিকে নামছে।
শামসু অভিজ্ঞ মানুষ। তার হাত দ্রুত চলে। তাই সে সবার থেকে একটু এগিয়ে আছে। মানে সে একটু আগেই ১২ তলার দিকে নামতে শুরু করেছে। এই কারণে অন্যদের সঙ্গে তার একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কেউ একটু ওপরে, কেউ একটু নিচে।
ঠিক তখনই শামসুর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।
রং মাখা হাত দিয়েই পকেট থেকে ফোনটা বের করল শামসু। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল—বিলকিস ফোন দিছে। ফোন রিসিভ করেই বলল,
“কি গো বউ, কিছু কইবা?”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো ছোট্ট একটা গলা। মুনিয়া।
“বাপজান, আমি তোমার বউ না… আমি তোমার মাইয়া মুনিয়া।”
শামসু হেসে উঠল।
“ওরে আল্লাহ! আমার মাইয়া দেখি বাপজানরে ফোন দিতে শিখ্যা গেছে!”
একটু আদুরে গলায় আবার বলল,
“তা আমার আম্মাজান, ফোন দিছস ক্যান? আম্মাজানের কি কিছু লাগবো?”
মুনিয়া এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল,
“বাপজান, আমি ক্লাস থ্রিতে উঠসি। আমি ক্লাসে ফার্স্ট হইসি।”
কথাটা শুনে শামসুর মুখ ভরে গেল হাসিতে। চোখের কোণায় চিকচিক করে পানি জমে উঠল। সে খুশি ভরা গলায় বলে উঠল,
“ওরে আল্লাহ… আমার আম্মাজান ক্লাসে ফার্স্ট হইসে!”
এরপর ফোনটা একটু কান থেকে সরিয়ে পাশে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওই মিয়ারা শুনো, আমার মাইয়া ক্লাসে ফার্স্ট হইসে। দোয়া কইরো সবাই।”
সবাই একসাথে হেসে বলে উঠল,
“আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! মিষ্টি খাওয়াইতে হইবো শামসু ভাই!”
এই কথা শুনে শামসুর মুখে লজ্জা মেশানো একটা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসির ভেতরেও গর্ব ছিল। চোখের কোণায় তখনো পানি চিকচিক করছিল। সে আবার ফোনটা কানের কাছে এনে বলল,
“আমার আম্মাজানের কী লাগবো? খালি কও… তোমার আব্বা জান দিয়া হলেও আনবো।”
ওপাশ থেকে মুনিয়া বলল,
“বাপজান, আইজ গরুর মাংস দিয়া ভাত খাইতে মন চায়। তুমি গরুর মাংস আনবা?”
শামসু একটুও দেরি না করে বলল,
“অবশ্যই আনমু। আমার আম্মাজান গরুর মাংস খাইতে চাইছে, আব্বা না আনলে হয় নাকি?”
একটু থেমে আবার নরম গলায় বলল,
“আম্মাজান, তোমার মায়েরে একটু ফোনটা দাও তো। কথা কই।”
“আইচ্ছা, দিতাছি…”
কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে বিলকিস বেগমের গলা ভেসে এলো,
“হ্যালো…”
শামসু গর্ব মেশানো গলায় বলল,
“দেখলি বউ, আমি কইছিলাম না—আমাগো মাইয়া অনেক বড় হইবো।”
ওপাশে নিশ্চয়ই বিলকিস হেসেছিল। হাসিটা দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু গলায় ঠিকই বোঝা যাচ্ছিল। একটু অভিমান মেশানো সুরে সে বলল,
“আপনে মাঝে মাঝে এমন কন, মনে হয় মাইয়া শুধু আপনার একলার।”
ওপাশ থেকে শামসুর হাসির শব্দ ভেসে এলো।
“আরে পাগলি, মাইয়া শুধু আমার হইবো ক্যান? এইটা তো আমাগো দুইজনের মাইয়া…”
একটু থেমে সে কিছুটা গম্ভীর গলায় বলল,
“শুন, মাইয়া আমার গরুর মাংস দিয়া ভাত খাইবার চাইছে। গরুর মাংসের যে দাম… কী করি ক তো বউ?”
“আরে বাদ দেন, মাইয়া কইলেই আনতে হইবো নাকি?”
শামসু ধীরে বলল,
আরে না, মাইয়া তো ফার্স্ট হইছে। আজ যেভাবেই পারি গরুর মাংসের ব্যবস্থা করমু। ভাবতেছি কন্ট্রাক্টরের কাছ থেইকা একটু টাকা ধার নেই। তারপর আধা পোয়া মতো মাংস আনমু। তুই ওইটা ভুনা ভুনা কইরা রান্না করবি—মাইয়া ভুনা মাংস খুব পছন্দ করে।
বিলকিস একটু থেমে বলল,
“আধা পোয়া মাংস আনলে, আপনে খাইবেন কী?”
শামসু সহজ গলায় বলল,
“আমার খাওয়া লাগবো না। তুই মাইয়ার লাইগা ব্যবস্থা করো।”
বিলকিস কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। মনে হয় কিছু একটা ভেবে নিল। তারপর বলল,
“আইচ্ছা, আপনি আনেন আধা পোয়া মাংস। আমি একটা ব্যবস্থা করমু, যাতে সবাই খাইবার পারি।”
এই কথা শুনে শামসুর মনটা ভরে গেল। সে হালকা হেসে বলল,
“বুজলি বউ, কী ভালো কাজ করছিলাম জানি না—তোর মতো বউ আর এমন মাইয়া পাইছি। দেখিস, এই মাইয়াই একদিন আমাগো সুখে রাখবো।”
শামসুর কথা শুনে বিলকিস বলল,
“আপনে এইগুলো কী কন! সুখ আমরা একসাথেই দেখমু।”
শামসু বলল,
“আচ্ছা বউ, রাখি তাহলে। অনেক কাম পড়া আছে। আমি আসার সময় গরুর মাংস নিয়ে আইমু ।”
ফোনের লাইন কেটে দিয়ে শামসু পকেটে মোবাইল রাখল। তারপর একটু উপরে ঝুলে থাকা বেলালের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওই বেলাল, খালি গান গাইলেই হইবো নাকি? তাড়াতাড়ি হাত চালাও, মিয়া! তুমি তো দেখতেছি এখনো সবার থাইকা পিছাইয়া আছো।”
এই কথা বলেই শামসু দড়িটা একটু ঢিলা দিল। ধীরে ধীরে ১৩ তলা থেকে ১২ তলার দিকে নামতে লাগল।
বেলাল নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জি ভাই, করতাসি। আপনে চিন্তা কইরেন না, কাম হয়ে যাইবো।”
এই বলে সে আবার কাজে মন দেবে—ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল শামসুর ঝুলে থাকা রশির দিকে।
এক সেকেন্ডের জন্য সে বুঝতেই পারল না, ঠিক কী দেখছে। তারপর হঠাৎ করে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
হুকটা ঠিকমতো লাগানো না।
বেলাল এক ঝটকায় সোজা হয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল। তারপর যত জোরে পারে চিৎকার করে উঠল—
“শামসু ভাই সাবধান! আপনার দড়ির বাঁধন খোলা! দড়ি বাঁধেন তাড়াতাড়ি!”
ওদিকে শামসু তখন দড়িতে আরেকটু ঢিল দিচ্ছে। নামছে ধীরে ধীরে ১৩ তলা থেকে ১২ তলার দিকে । বেলালের গলা কানে যেতেই সে উপরের দিকে তাকাল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দড়িটা হালকা একটা ঝাঁকুনি খেল।
খুব ছোট একটা ঝাঁকুনি।
কিন্তু সেইটুকুই যথেষ্ট ছিল।
শামসু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার শরীরটা হঠাৎ করে নিচের দিকে ছেড়ে দিল।
হাত দিয়ে কিছু ধরার সুযোগই পেল না।
একটা মুহূর্ত—সবকিছু থেমে গেল যেন।
তারপর—সে পড়তে শুরু করল নিচের দিকে ।
যখন দড়িটা খুলে গেল, শামসু তখন ১২ তলার একেবারে কাছাকাছি। মুহূর্তটা এত দ্রুত ঘটল যে কেউ ঠিকমতো বুঝে উঠার আগেই সবকিছু বদলে গেল। বেলাল চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে একদম ভেঙে পড়ার মতো গলায় চিৎকার করে উঠল—
“আল্লাহ! ও আল্লাহ! শামসু ভাই, কিছু একটা ধরেন! তাড়াতাড়ি ধরেন!”
চিৎকারটা এমন ছিল, যেন তার নিজেরই কিছু হয়ে গেছে। উপরে যারা ছিল, সবাই একসাথে থেমে গেল। হাতের ব্রাশ, দড়ি—সবকিছু স্থির হয়ে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। নিচে যারা ছিল, তারাও মাথা তুলে তাকাল। সব চোখ এক জায়গায় গিয়ে আটকে গেল—
শামসু।
ওদিকে শামসু খুব পরিষ্কারভাবে বুঝে ফেলেছে—
সে পড়ছে। এটা আর কোনো ভুল না। এটা সত্যি। প্রথম ধাক্কায় সে হাত বাড়িয়ে পাশের ঝুলে থাকা রশিগুলোর দিকে ধরার চেষ্টা করল। একটা রশি তার একেবারে হাতের নাগালে এসেও গেল।
আর এক ইঞ্চি হলেই ধরতে পারত।
কিন্তু পারল না।
তার হাত ফাঁকা বাতাসে কেটে গেল।
১২ তলা আর ১১ তলার মাঝামাঝি এসে হঠাৎ করেই আরেকটা ধাক্কা খেল সে।
ঝুলানো একটা বাঁশের সঙ্গে জোরে বাড়ি খেল তার শরীর। ধাক্কাটা এতটাই হঠাৎ ছিল যে সে দিক ঠিক রাখতে পারল না। বিল্ডিংয়ের দেয়াল থেকে ছিটকে একটু দূরে চলে গেল।
এই একটাই ঘটনা সব শেষ হয়ে গেল।
দেয়ালের কাছাকাছি থাকলে হয়তো আরেকটা সুযোগ ছিল—কিছু একটা ধরার, কিংবা ঠেকার।
কিন্তু এখন সে পুরোপুরি খোলা আকাশে ঝুলে থাকা একটা শরীর। ভারসাম্য একদম হারিয়ে ফেলেছে। এখন আর কিছু ধরার মতো দূরত্ব নেই।
কোনো ভর নেই।
কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
শামসু শুধু নিচের দিকে পড়ছে।
আর কিছু করার নেই তার।