“এই যে ভাইয়া, শুনতাছেন…”
পেছন থেকে কে যেন আনিসকে ডাকলো। শুনেও সে না-শোনার ভান করে হাঁটতে লাগল। মনে মনে ভাবল— এত রাতে, এই জনমানবহীন জায়গায় কে তাকে ডাকবে?
ডাকাত?
নাকি… কোনো দুষ্টু ভূত?
ছোটবেলায় কত গল্প শুনেছে— গভীর রাতে গ্রামের খোলা মেলার জায়গায় নাকি খারাপ ভূতরা পেছন থেকে ডাক দেয়। সেই ডাকের উত্তরে যদি ভুল করে তাকালেই নাকি সর্বনাশ।
আনিস নিজেকেই বোঝাতে লাগল, ভূত বলে কিছু নেই…
তবুও যেভাবে ডাকা হলো— কেমন যেন হাড়ের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা একটা শিরশিরানি উঠে এলো।
তাকাবে কি না—
এই সামান্য সিদ্ধান্তই যেন মুহূর্তে খুব বড় হয়ে গেল।
আবারও সেই কণ্ঠ—‘
এই যে ভাইয়া… শুনতাছেন?’
আনিস আবারও শুনেও না–শোনার ভান করে হাঁটতে লাগল। তবু ঠান্ডা ঘাম নেমে এলো তার পিঠ বেয়ে। চারদিকে গা–ছমছমে অন্ধকার, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাতাসে গাছের ডাল নড়ার শব্দ, দূরে শেয়ালের হুক্কা–হুয়া। মাঝে মাঝে খালের পানি ছপছপ করে ওঠে। এই সময়ে কাউকে ডাকবার কথা নয়—আনিস বুঝে উঠতে পারছিল না, কী হচ্ছে।
দাউদকান্দির ছেলে আনিস পড়াশোনার জন্য ঢাকা এসেছিল। কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে অবশেষে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পেয়েছে। পোস্টিং তাড়াইল উপজেলার নিরিবিলি এক গ্রাম—রাউতি।
সকাল নয়টায় ঢাকা থেকে রওনা হয়েছিল সে। নান্দাইল চৌরাস্তায় নামতে নামতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজল। ফাঁকা রাস্তা। কোথাও মিটমিটে লাইট, কোথাও কুপিবাতির হলদে আলো। দূর থেকে ভেসে আসছে জারি গানের সুর—রাতের হাওয়ায় এমনিতেই সবকিছু একটু বেশি পরিষ্কার শোনা যায়।
সামনে সাত–আট কিলোমিটারের পথ। রিকশা, নৌকা বা হেঁটে— এই তিনটাই উপায়। তিনজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলেও লাভ হলো না। যে একজন রাজি হলো, তার ভাড়া আনিসের সাধ্যের বাইরে। থাকার জায়গা ঠিক নেই, খাওয়ার ব্যবস্থাও হয়নি। হাতে আছে অল্প কিছু টাকা। এই অবস্থায় রিকশার কথা বাদ দিয়ে আনিস হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল।
(তখনকার সময়—নব্বইয়ের আগের কথা—দেশের অনেক জায়গাতেই তখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।)
হাঁটা শুরু করার আগে আনিস ঢুকল এক চায়ের দোকানে। দোকানদার কুপিবাতি জ্বালানো— লুঙ্গি পরা, খালি গায়ে। চারপাশে কাঁঠাল গাছের ছায়া, বাঁশের বেঞ্চ, দূরে শেয়ালের ডাক আর ব্যাঙের শব্দ। অন্ধকার এমন যে আমাবস্যা না হলেও মনে হয়, আলো গিলে খেয়েছে কেউ।
রাউতির রাস্তা জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার বলল—ওটা কাঁচা রাস্তা, রাতে রিকশা মেলে না, আর ডাকাতের ভয় আছে। শোনার পর আনিসের মন আরও খারাপ হয়ে গেল। সারাদিন বাস নষ্ট হয়ে নষ্ট হয়েছে তার শক্তি; দুপুরেই পৌঁছানোর কথা ছিল, কিন্তু সন্ধ্যায় এসে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে আছে শুধু কাপড়ের ব্যাগ আর মায়ের দেওয়া এক টিন মুড়ি।
রিকশার ভাড়া বেশি, জায়গাটা অপরিচিত, কাউকেই সে চেনে না। হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সামনে এগোতেই আনিসের ঝামেলা শুরু হলো। আবারও পেছন থেকে ভেসে এলো সেই একই কণ্ঠস্বর।
“এই যে ভাইয়া, শুনতাছেন…”
আনিস আবারও না শোনার ভান করল। এবার হাঁটা জোরে দিল। আর মনে মনে ভাবছে—সামনে কী হতে চলেছে কে জানে। সাথে সাথে আবারও সেই একই কণ্ঠস্বর। তবে এবার কণ্ঠে হাসির আভাস—
“আরে ভাইয়া, আমি কোনো চোর-ডাকাত না, একটু খামুইন …”
আনিস কী ভেবে যেন থেমে গেল। পিছনে ফিরে তাকিয়ে অবাক— একজন সুঠাম, পরিপাটি যুবক এগিয়ে আসছে। বয়স আনিসের সমানই হবে। অন্ধকারের মধ্যেও লোকটার গড়ন স্পষ্ট।
“ভাইয়া, কতক্ষণ ধইরা ডাকতাছি! আপনি তো না–শুইন্যা হাঁটতাছেন।”
বাক্য শুনে আনিস লজ্জা পেল।
“ভাই, কিছু মনে করবেন না। জায়গাটা চিনি না, তার ওপর দোকানদার ডাকাতের ভয় দেখাইছিল…”
লোকটা হেসে বলল—
“না ভাইয়া, কনো সমস্যা নাই। রাস্তা ফাঁকা, তাই ডাকাত–টাকাতের ভয় একটু–আধটু থাকে।”
তারপর জিজ্ঞেস করল—
“আপনে কি ঢাহাত্তন আইসুন( ঢাকা থেকে এসেছেন)?”
“জি।”
“কই যাইবেন?”
“রাউতি গ্রামে।”
লোকটা সাথে সাথে বলল—
“আরেহহ, আমি–ও ওইখানেই যামু! কোন বাড়িত যায়বায়ন (যাবেন)?”
“রাউতি প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার তোবারক স্যারের বাড়ি।”
“ওহহহ! উনার বাড়ি আমার বাড়ির পাশত (পাশে)। ভালোই হইলো, এক লগে যায়ন যাইবো।”
আনিস জানতে চাইল—
“ভাই, আপনার নাম?”
“মিজান। আপনের?”
“আনিস।”
মিজান হাসল।
“মনে হয় আপনে নতুন। চিন্তা কইরেন না, একসাথে গেলে কোনো সমস্যা হইব না। তা, আপনে কি তোবারক স্যারের আত্মীয়?”
“না ভাই, আমি রাউতি প্রাইমারি স্কুলে জয়েন করতে আসছি।”
“ওও… তাইলে আপনে আমাগো স্কুলের মাস্তর (মাস্টার)”
“জি ভাই।”
“আগে কোন স্কুলে ছেলাইন, না এইডাই প্রত্যুইম?”
“এইটাই আমার প্রথম।”
“কোন বিষয় পড়াইবেন?”
“অঙ্ক।”
“ওওও আইচ্ছা, তয় এত দেরি হইল ক্যান?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনিসের উত্তর,
“সেই সকালে রওনা দিয়েছিলাম। রাস্তায় পাঁচবার বাস নষ্ট হয়েছিল। তাই দেরি।”
মিজান মাথা নেড়ে বলল—
“ঢাহার লগে আমাগো যাতায়াতের ব্যবস্থা খুব খারাপ। সবটাই লোকাল বাস।”
আনিস হঠাৎ জানতে চাইল—
“আপনি কী করেন?”
মিজান একটু হেসে বলল—
“কিছুও করি না। গ্রামত থাকি, ঘুরাফেরা করি।”
“তাহলে এত রাতে কোথা থেকে আসছেন?”
মিজান বলল—
“অনেক দূর থেইকা।”
আনিস কৌতূহলী হয়ে বলল,
“অনেক দূর মানে?”
মিজান হেসে উত্তর দিল,
“আরে ভাইয়া, আপনে তো ধাকার মানুষ। ওইডা চিনবেন কেমনে?”
আনিস কিছুটা লজ্জা পেল। মনে মনে ভাবল—তাই তো, জায়গার নাম শুনলেও চিনতে পারতাম না।
আনিস চুপ করে গেল। কিছুক্ষণের নীরব হাঁটা। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। দূরে শেয়ালের হুক্কা–হুয়া। অন্ধকারটা যেন আরও ঘন হয়ে এলো…
ফ্যাকাশে চাঁদের আলোয় কাঁচা রাস্তা বোঝা যায়, ধারের লম্বা ঘাস বাতাসে দুলছে। কোথাও ডালে পাখি নড়ে আবার থেমে যাচ্ছে। এই নিশ্চুপ পরিবেশে প্রতিটি শব্দ দশগুণ জোরে শোনা যায়।
আনিসের মনে হলো—অন্ধকার তাকে ঘিরে ধরছে।
নীরবতা ভেঙে আনিস বলল—
“মিজান ভাই, কয়টা বাজতে পারে?”
মিজান উত্তর দিল—
“বোধহয় সাড়ে আটটা থেইকা নয়টা।”
“মাত্র নয়টা! অথচ মনে হচ্ছে গভীর রাত,” আনিস বলল। “গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই এমন লাগে।”
মিজান মাথা নেড়ে বলল—
“হ ভাইয়া, এখানে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমায়। ডাকাতের ঝামেলাও আছে, তাই মানুষ রাতে বাহির হয় না। ওরা সাধারণত বড় বাড়িতে টার্গেট করে, রাস্তায় ঘোরাফেরা কম।”
শুনে আনিস কিছুটা স্বস্তি পেল।
কিন্তু হঠাৎ মিজান গলা একটু ভারী করে বলল—
“তবে মাঝে মাঝে শেয়াল দল বেঁধে রাস্তায় উঠে পড়ে। কাউরে পাইলে একসাথে ঝাঁপাইয়া পড়ে।”
গল্পটা শুনে আনিস খুব ভয় পেল না। গ্রামে সে এমন ঘটনা দেখেছে। তার ব্যাগে কেরোসিনের ছোট বোতল আর ম্যাচ আছে— আগুন দেখালে শেয়াল পালাবে।
আনিস আবার জিজ্ঞেস করল—
“শেয়াল আর ডাকাত ছাড়া আর কিছু?”
মিজান হেসে উত্তর দিল—
“আর কোনো সমস্যা নাই।”
আনিস স্কুলের অবস্থা জানতে চাইল—কতজন শিক্ষক, কীভাবে চলে। মিজানও দেরি না করে সব বলে দিল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মিজান বলল—
“আনিস ভাইয়া, সাব্ধানে (সাবধানে) যাইয়েন। সামনে রাস্তাডার সাইডে কাটা আছে—মাঝ দিয়া যান।”
আনিস তাকিয়ে দেখল—রাস্তা সত্যিই ভেঙে গেছে। বর্ষার পানি টেনে মাটি সরে গেছে, নিচে এখনো ছপছপ শব্দ।
ভাঙা অংশটা পার হতেই দূরে ছোট্ট একটি আলো দেখা গেল—
“ওইখানে বাজার?” আনিস জিজ্ঞেস করল।
“না ভাইয়া, বাজার না। মনে হয় কতক মানুষ মাছ ধরতেছে। সামনে জেলে পাড়া—ওরা রাতে মাছ ধরে,” মিজান বলল।
এই সময় নদীর দিক থেকে ভেসে এলো সুর—
“নাও ছাড়িলো বন্দরে, মাঝি নাও বাইয়া যা…”
আনিস থমকে বলল—
“গানের গলার সুরটা সত্যিই সুন্দর, তাই না মিজান ভাই?”
কাছে গিয়ে দেখা গেল, নদীর কিনারায় কয়েকজন জেলে মাছ ধরছে।
হাঁটতে হাঁটতে কথা চলল। আনিস জানল—
মিজানের তিন বোন ঢাকায় থাকে, দুইজনের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ভাই—একজন বাড়িতে, আরেকজন খুলনায় চাকরি করে। বাবা গ্রামের পরিচিত মানুষ যাঁকে সবাই চেনে।
আরও জানল—
গ্রামে একটি মাত্র ডালিম গাছ আছে, ঠিক মিজানের ঘরের পাশে। পাশাপাশি আছে দুটো নারিকেল গাছ। সেই গাছের ডাব নাকি গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি, আর নারিকেলও সবচেয়ে বেশি ধরে।
আনিস জিজ্ঞেস করল—
“ভাই, ডালিম গাছের ফলন কেমন হয়?”
মিজান বলল—
“অহনও খাই নাই। তয় মনে হয় বালা হইবো।”
“মানে—আগে কখনো ডালিম ধরেনি?”
মিজান হেসে উঠল—
“ধরছে। কিন্তু খাওয়া হয় নাই। এইবার অনেক ফুল ধরছে—এইবার বালা ডালিম আইবো।”
আনিস হাসল—
“ডালিম আসলে যাবো আপনার বাড়িতে, ডালিম খাওয়ার জন্য।”
“অব্বই (অবশ্যই) যাইবেন! ডাবও আছে অনেক। খাইয়া কইবেন—আমার ঘরের পাশের গাছের ডাব কত মিঠা,” মিজান গর্বের সুরে বলল।
“জি ভাই। আচ্ছা, আর কত দূর?”
মিজান উত্তর দিল—
“অর্ধেকের চাইতেও বেশি আইছি। আর চল্লিশ মিনিটে পইছামু।”
হাঁটতে হাঁটতে আনিস দূরে কয়েকটা আলো দেখল—
“ভাই, মনে হয় বাজার।”
“হ ভাইয়া, সামনে বাজার,” মিজান বলল।
বাজারের কাছে এসে আনিস বলল—
“সব দোকান বন্ধ। শুধু ওই দোকানটার ভেতরে আলো জ্বলছে। পানি খেতে হবে—চলুন, দেখে আসি।”
মিজান মাথা নেড়ে বলল—
“হ ভাইয়া, আপনে যান। আমি একটু সামনে যাইতাছি। ওইখানে দাঁড়ামু। আপনে পানি খাইয়া আইসেন।”
“আপনি যাবেন না?”
“না ভাইয়া, পেশাব করমু। আর ভাই… আমার লাইগা দুইটা বিড়ি নিয়া আইসেন। রাইতে লাগবো—আমার লগে আছে মাত্র একখান বিড়ি। এই গ্রামের সবাই আমার মুরব্বি, তাই কারও কাছে বিড়ি চাইতে পারি না। আপনে পানি খাইয়া আইসেন—আমি এইখানেই দাঁড়াইয়া আছি।”
এই কথা বলে মিজান সামনে হাঁটা ধরল।
এক পলকের মধ্যেই অন্ধকার যেন তাকে পুরো গ্রাস করে ফেলল। আনিস একটু থেমে এগিয়ে গেল—
হালকা আলো জ্বলা বন্ধ দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল। আনিস দোকানের সামনে গিয়ে ডাকল—
“ভাই, কেউ আছেন? একটু পানি খাওয়ানো যাবে? আমি ঢাকা থেকে এসেছি, রাউতি যাবো।”
ডাক দিতেই দোকানের আলো যেন একটু ম্লান হয়ে গেল। ভেতর থেকে কেউ তাকাল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল—
“একটু দাঁড়াইয়েন।”
কিছুক্ষণ পর চৌপাট সামান্য ফাঁক হয়ে খুলল। একটা গ্লাস এগিয়ে দেওয়া হলো। আলো এমন কম যে মানুষটার বয়স বোঝা গেল না।
পানি খেয়ে আনিস জিজ্ঞেস করল—
“রাউতি আর কত দূর?”
উত্তর এল—
“এই গ্রামের পরেই রাউতি, সামনে পুরোরা বাজার। বাজারের লগে বাঁধ আছে—ওই দিক দিয়া গেলে তাড়াতাড়ি যাইবেন। তয় ওই বাঁধ দিয়া যাইয়েন না, কাইন্ডা (কারণ) শেয়াল ঘুরে।”
আনিস বলল—
“ভাই, আমাকে ২টা বিড়ি দিতে পারবেন?”
উত্তর এল—
“আমার দোকানে বিড়ি রাখি না।”
আনিস বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল। একটু এগোতেই দেখল—মিজান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
“ভাই, চলেন। আপনার বিড়ি আনতে পারলাম না, দোকানে রাখে না।”
মিজান কোনো কথা না বলে পাশে পাশে হাঁটা ধরল।
আনিস জিজ্ঞেস করল—
”এর পরের বাজারের নাম কী?”
“পুরোরা বাজার।”
“ওখান থেকে রাউতি কত দূর?”
“পুরোরা বাজারের পরেই বান্নাতি বাজার। ওই বাজারের লগে একটা রাস্তা গেছে—সরাসরি রাউতি। কিন্তু আমরা পুরোরা বাজারের লগে বাঁধ দিয়া যামু। বিশ–পঁচিশ মিনিট বাঁচবো।”
আনিস একটু দ্বিধায়—
“ভাই, এত রাতে বাঁধ দিয়ে গেলে যদি শেয়াল ধরে?”
মিজান হালকা বিরক্তির সুরে বলল—
“সমস্যা হইবো না, কারণ ওই বাঁধ থেইকা জঙ্গল অনেক দূর। শেয়াল সাধরণত ওই বাঁধে কম আসে। আর যদি আইসা পড়ে, পরে দেখন যাইবো।”
আনিস বলল—
“আমিও গ্রামের ছেলে, তাও ভয় লাগছে।”
হঠাৎ মিজান গলা শক্ত করে বলল—
“তাহলে আপনে বান্নাতি বাজার দিয়া যান। আমি বাঁধ দিয়া যাইমু।”
মিজানের আচরণে আনিস একটু চমকে গেল। চুপ থাকতে না পেরে প্রসঙ্গ বদলাল—
“আপনাদের গ্রামে নৌকায় যাওয়া যায় শুনছি? নৌকায় গেলে কতক্ষণ লাগে?”
মিজান এবার শান্ত গলায় বলল—
“সকাল থেইকা রওনা দিলে বিকালেই পইছাইয়া যায়।”
এভাবেই কথা বলতে বলতে দু’জনে পুরোরা বাজারে ঢুকে পড়ল।
মিজান বলল—
“ভাইয়া, আমি বাঁধ দিয়া যাইমু। আপনে নিশ্চিন্তে আমার লগে আইসেন।”
আনিস আর কথা বাড়াল না। দু’জনে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর এগোতেই মিজান হঠাৎ বলল—
“ভাইয়া, আমরা আইসা গেছি।”
কথাটা শুনে আনিস চমকে গেল। এত দ্রুত? চারপাশ ফাঁকা, এখনো তো বাঁধের মাঝখানে! লোকালয়ের কোনো হদিসই নেই।
মিজান আবার বলল—
“এই দিক দিয়া সোজা দক্ষিণে যাইয়েন। সামনে বেল্লালগো বাড়ি… । ওইটার পাশ দিয়া গেলেই বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড় পার হলোই মসজিদ পাইবেন। আর… মসজিদের পাশেই তোবারক স্যারের বাড়ি।
আপনে যান ভাইয়া, আমি আর না আগাই । আমি আমার বাড়িত যাই।
বালা থাকেন… আসসালামু আলাইকুম।”
কথা শেষ করে সে পাশ ফিরল, আর কোনো দিকে তাকাল না; সোজা পশ্চিমে হাঁটা দিল।
আনিস ডাকল—
“মিজান ভাই, দয়া করে একটু দিয়ে আসেন! আমি তো পথ চিনি না!”
মিজান একবারও পিছনে তাকাল না। কোনো উত্তরও নয়। শুধু একই ছন্দে হেঁটে চলে গেল।
আনিস এবার আরও জোরে বলল—
“ভাই, দয়া করে… একটু দিয়ে আসেন! আমি ………..”
কিন্তু লাভ হলো না। মিজানের ছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আনিস অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। রাগ, অবাক—দুটোই একসাথে। তবুও মিজানের বলা পথ ধরে এগোতে লাগল। চলতে চলতে তার মনে হতে লাগল—এই গ্রামের মানুষ কেন এমন? দোকানদারও তো পুরো চৌপাট খুলল না, মাত্র একটু ফাঁক করে পানি দিল।
পথে হাঁটতে হাঁটতে সন্দেহ আরও বাড়ল। এটা আসলেই রাউতি গ্রাম তো ? নাকি মিজান ভুল পথে এনেছে?
আশ্চর্যের বিষয়—মিজান যে দিক ও চিহ্ন বলে গিয়েছিল সব ঠিকঠাক মিলছে। কয়েকবার বুক ধুকধুক করলেও শেষমেশ সে গ্রামে ঢুকে পড়ল। মসজিদ দেখে তার ভয় কিছুটা কমল। মনে মনে ভেবেছিল—যদি ভুল জায়গা হয়, তবে এখানেই রাতটা কাটাবে; সকালে পথ জেনে নেবে।
তবু মিজানের অদ্ভুত ব্যবহার মাথায় ঘুরতেই থাকল।
মিজানের কথামতো মসজিদের পাশের বড় উঠানওয়ালা এক ঘরের সামনে গিয়ে আনিস দাঁড়াল।
টিনের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে ডাকল—
“এটা কি তোবারক স্যারের বাড়ি? আমি আনিস… ঢাকা থেকে এসেছি।”
ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। পুরো বাড়িটাই অন্ধকার। উঠানের পাশে কয়েকটা গাছ—চাঁদের আলোয় যেন মানুষের মতন দেহভঙ্গি।
আনিস আবার ডাকল—এবার একটু জোরে।
ভেতর থেকে গলা এল—
“আপনে কে?”
আনিস নিজের পরিচয় দিল।
তারপরই ভেতর থেকে মোটা এক গলা—
“ঢাকার মেহমান আইছে, ওঠ তরা!”
‘ঢাকার মেহমান’—এই কথা শুনে আনিসের বুকটা হালকা হলো। মনে মনে মিজানকে ধন্যবাদ দিল। তার প্রতি যে রাগ জন্মেছিল, সেটা কিছুটা কমেও গেল।
ঘরের ভেতর হারিকেনের আলো জ্বলল। কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে বের হলেন ছোটখাটো এক বয়স্ক লোক।
তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন—
“এত দেরি ক্যান? আপনের তো দুপুরে আসার কথা আছিল।”
আনিস বলল—
“বাস নষ্ট হয়েছিল, তাই দেরি।”
লোকটি নিজের পরিচয় দিলেন—তিনি তোবারক সাহেব, স্কুলের হেডমাস্টার। আনিসকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বললেন—
“ওই দিকটায় কলপাড়। যান, হাত–মুখ ধুয়ে আসুন। খাবারের ব্যবস্থা করছি।”
আনিস ঘরে ঢুকে ব্যাগটা আর মুড়ির টিনটা এক পাশে রেখে কলপাড়ে গেল। হাত–মুখ ধুয়ে ফিরে এসে ঘরে পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল ভেতরের ঘর থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে। ঠিক কাশি নয়, আবার পুরো কান্নাও না। চাপা, ভাঙা—ঘোগানির মতো একটা আওয়াজ। শব্দটা অদ্ভুতভাবে তার কানে এসে লাগছিল। এতটাই যে, একবার মনে হলো—ডাক দেবে। পরমুহূর্তেই ভয় লাগল। অপরিচিত বাড়ি, অপরিচিত মানুষ।
কে আছে ভেতরে?
কী হয়েছে তার?
আনিস চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শব্দটা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ ভেসে আসছে। শুনতে শুনতে তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি জমে উঠল। খারাপ লাগছিল— কেন লাগছে, সেটা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছিল না।
ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক মধ্যবয়স্ক নারী। হাতে খাবারের বাটি। মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। ঠিক তার পেছনেই তোবারক সাহেব। শব্দটা আর শোনা যাচ্ছে না। যেন ঘরের ভেতরে কিছু একটা হঠাৎ চুপ করে গেছে।
মধ্যবয়স্ক নারী খাবার সাজিয়ে দিলেন। তোবারক সাহেব পাশে বসে আনিসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
“এত রাতে কেমনে আইলেন এত দূর রাস্তা?”
আনিস হেসে বলল—
“কোনো সমস্যা হয়নি। আপনার গ্রামের মিজান ভাইকে রাস্তায় পেয়েছিলাম । উনার সাথে গল্প করতে করতে চলে এসেছি। ”
তোবারক সাহেব হঠাৎ থেমে গেলেন।
“কার লগে?”
“মিজান ভাই,” আনিস নিশ্চিন্ত গলায় বলল।
তোবারক সাহেবের মুখ ম্লান হয়ে গেল।
“ওহ… আচ্ছা।”
তার গলায় হতাশার ছোঁয়া।
খাওয়া দাওয়া শেষে আনিস ক্লান্ত শরীরে চমৎকার ঘুম দিল। সকালে বাইরে এসে অবাক—বাড়ির সামনে দিয়ে বিশাল ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী, নৌকা চলছে। দৃশ্য দেখে তার মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে গেল।
নাশতার পর তোবারক সাহেব তাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। ক্লাসে ক্লাসে ঘুরিয়ে শিক্ষক আর বাচ্চাদের সাথে পরিচয় করালেন। পাশের বড় বিস্তীর্ণ মাঠ দেখে আনিসের মনটা হালকা হয়ে গেল—গ্রামের স্কুলল হলেও একটা আলাদা শান্তি আছে।
হেডমাস্টার জানালেন—
আপাতত আনিস থাকবে তার পুরোনো বাড়িতে; সঙ্গে থাকবে তত্ত্বাবধায়ক দবির। নতুন মাস্টার আসায় সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল—ঢাকা থেকে এই প্রথম শিক্ষক এসেছেন, এটাও তাদের কাছে বিশেষ ঘটনা।
মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেল আনিসের কথা। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে একটাই কথা— “গ্রামের স্কুলে ধাক্কা থাইক্কা ( ঢাকা থেকে ) নতুন মাস্তর আইছে।“
দিন গড়াতে আনিসও ধীরে ধীরে সবার সাথে মিশে গেল।
বিকেলবেলায় হেঁটে হেঁটে বাজারের দিকে গেল আনিস। বাজারে ঢুকতেই তার মনে হলো—এ গ্রামের মানুষের আন্তরিকতা যেন অতিরিক্তই হয়ে গেছে। বসির মিয়া দূর থেকে দেখেই ডাক দিল, হাসিমুখে—
“মাস্তর সাব… এইদিক আইসেন। এক কাপ চা খাইয়া যাইযান।”
আনিস খুশি মনে দোকানে ঢুকল। দোকানে আরও চারজন গ্রামবাসী বসে ছিল। আনিসকে দেখেই সবাই উঠে সালাম দিল— যেন কতদিনের চেনা। বসার জায়গা করে দেওয়া হলো, তারপরই দোকান জুড়ে গল্পের রঙ। ঢাকার গল্প, শহরের ব্যস্ততা—সব শুনে তারা অবাক, মুগ্ধ, আবার একটু ভয়ও পায়।
চা খেয়ে গল্প শেষ করে আনিস ওঠার সময় হঠাৎ বলল—
“মিজানদের বাড়িতে যাওয়ার পথটা বলবেন?”
একজন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
“আপনে কোন মিজানের কথা জিগাইতাছেন?”
আনিস খুব স্বাভাবিকভাবে বলল—
“তা বলতে পারব না কোন বাড়ির মিজান। তবে জানি, উনার বোনরা ঢাকায় থাকে। আর তাদের বাড়ির পাশে নাকি একটা ডালিম গাছ আছে।”
এ কথা শুনেই পুরো দোকানে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশটা কেমন যেন বদলে গেল।
পাশ থেকে একজন কাঁপা গলায় বলল—
“আপনে… মিজানরে কেমনে চিনলেন?”
আনিস একটু অবাক—
“ওভাবে চিনিনি। উনি আমাকে গতকাল রাতে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছেন।”
এই কথাটা দোকানের ভেতর ছড়িয়ে পড়তেই সবাই যেন থমকে গেল। একজন পানি খেতে গিয়ে থেমে গেলেন। সবাই আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছে আনিসের দিকে—কিন্তু কেউ কথা বলছে না।
পাশের একজন আরও কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“স্যার… আসলেই… মিজান আপনাকে পথ দেখাইছিল?”
আনিস বিরক্ত হয়ে বলল—
“হ্যা। কেন? আপনারা আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছেন কেন?”
যে লোকটি একটু আগে প্রশ্ন করেছিল, সে শুধু তাকিয়ে রইল—মুখে অদ্ভুত বিস্ময়। তার আগেই বসির মিয়া কথা বলল—
“স্যার, আপনি নতুন মানুষ… আপনার লগে কেউ বাইছলামী (দুষ্টামি) করছে। স্যার, বাড়ি যান। কয়দিন পর বুঝা যাবে — আপনার লগে কে বাইছলামী করছে।”
আনিস আরও বিভ্রান্ত।
“আপনারা কী বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
একটু থেমে বলল—
“যাই হোক, আমি যাই। পরে আরেকসময় আসব।”
এ কথা বলে আনিস দোকান থেকে বের হয়ে তোবারক স্যারের বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। রাতের খাবার খেয়ে সে তত্ত্বাবধায়ক দবিরকে নিয়ে তোবারক স্যারের পুরোনো বাড়িতে যাবে—সেখানে থাকারই কথা তার।
এভাবেই কেটে গেল পাঁচ দিন।
মিজানের কথা মন থেকে মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। স্কুলের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, আর গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো তার সত্যিই খুব প্রিয় হয়ে গেছে।
একদিন… বিকেলের দিকে আনিস তোবারক স্যারকে জিজ্ঞেস করল—
“মিজান ভাইয়ের বাড়ি কোন দিকে?”
তোবারক সাহেব বললেন—
“তার বাড়ি পশ্চিম দিকেই। পাঁচটা বাড়ি পরেই মিজানদের বাড়ি।”
তারপর একটু থেমে নরম স্বরে যোগ করলেন—
“ওই বাড়িত যাইবার কি খুব দরকার আছে নাকি?”
আনিস হেসে বলল—
“না, এমনি যাবো। সেদিন মিজান ভাই আমাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছিল। পাঁচ দিন হয়ে গেল, এখনো দেখা হয়নি। একটু দেখা করে আসি।”
তোবারক সাহেব আর কিছু বললেন না। শুধু হাত তুলে পথটা দেখিয়ে দিলেন। তারপর চুপচাপ নিজের বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন—যেন কোনো কথা চেপে ফেললেন।আনিস মিজানদের বাড়ির দিকে এগোল।
দূর থেকেই চোখে পড়ল—দুটি লম্বা নারিকেল গাছ, তার পাশে টিনের একটি সুন্দর বাড়ি। বাড়ির পাশেই একটা পাকা দালান— বারান্দাটা যেন পানির উপর ভেসে আছে। দূর থেকে দৃশ্যটা শান্ত, অদ্ভুত… আবার সুন্দরও। আরও কাছে যেতেই আনিস দেখতে পেল—একটা ডালিম গাছ।
তার মনে খটকা লাগল।
মিজান যেমন বলেছিল—ডালিম গাছ আর নারিকেল গাছ—ঠিক তাই। কিন্তু যেটা সে ভাবেনি— এই জায়গাটা আসলে একটা পারিবারিক কবরস্থান।
ডালিম গাছের নিচে তিনটি কবর। দুটি ছোট—বুঝাই যাচ্ছে বাচ্চাদের কবর। আর ডালিম গাছ আর নারিকেল গাছের মাঝখানে একটা বড় কবর।
ওই কবরের কালো টিনের মাথায় সাদা অক্ষরে লেখা….
নাম : মৃত. মিজান খান
পিতা : মৃত. আবুল হোসেন খান
জন্ম : ১/৬/১৯৬৩ ইং বাংলা ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭০ বঙ্গাব্দ
মৃত্যু : ১০/১০/১৯৮৭ ইং বাংলা ২৪ আশ্বিন ১৩৯৪ বঙ্গাব্দ