নিঃশাস
নিঃশাস
“কালকে ৬টার মধ্যে অফিসে চলে আইসো, সদরঘাট যাবো।”
অফিস থেকে বের হয়ে, CNG-তে উঠতে উঠতেই কথাটা বললাম আনোয়ারকে।
আনোয়ার একটু ঘাড় কাত করে তাকালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো—
“কই যাবেন?”
“শরীয়তপুর যাবো।”
“ঘুরতে?”
“হুম। শুনলাম ওইখানে নাকি একটা জমিদার বাড়ি আছে… আরেকটা হিন্দু মন্দিরও আছে। ওইগুলো দেখতে যাবো।”
“ওহ।”
আমি একটু হাসলাম। তারপর বললাম—
“এতদিন যাবৎ কত জায়গায় গেলাম—অস্বাভাবিক কিছু একটা দেখবো বলে। এখন পর্যন্ত কিছুই দেখলাম না। আফসোস ।”
আনোয়ার হালকা গলায় বললো—
“আমারে তো একবার ধরছিলো।”
আমি একটু চমকে তার দিকে তাকালাম।
“তাই নাকি? কোথায়? তোমার বাড়িতে?”
আনোয়ার মাথা নাড়লো।
“না… এই CNG-এর মধ্যে।”
আমি কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—
“কি বলো! এই CNG-তে?”
“জি।”
“এইটার মধ্যে?”
“না, এইটা না… আগে যেটা চালাইতাম, ওইটার মধ্যে।”
আমি একটু চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম—
“কি হইছিলো? বলো তো শুনি…”
আনোয়ার বলা শুরু করলো।
আমাদের CNG বনানী ৪ নম্বর রোড ধরে, তারপর কবরস্থান রোড পেরিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে উঠতেই জ্যামে আটকে গেল। অফিস ছুটির সময়—জ্যাম থাকবেই। তেমন একটা বিরক্ত হলাম না। বরং ভালোই লাগছিল। একটা কারণ আছে। আমি জ্যামে অভ্যস্ত—এটা তো আছেই। তার থেকেও বড় কারণ—
আনোয়ারের কাছ থেকে একটা অতিপ্রাকৃতিক গল্প শুনবো। এই ধরনের গল্প আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনি।
এয়ারপোর্ট রোডে উঠার পর বেশি দূর আগাতে পারলাম না।
তার আগেই আনোয়ার আমাকে হতাশ করে দিয়ে গল্পটা শেষ করে ফেললো—মাত্র তিন মিনিটে।
আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম—
“ধুর মিয়া, এইটা কোনো কিছু হইলো?”
আনোয়ার সাথে সাথে বললো—
“না, আমি সত্যি কইতাসি।”
“তা বুঝলাম, সত্যি বলছো… কিন্তু তোমার কি একবারও সন্দেহ হয় নাই?”
আনোয়ার একটু থামলো। তারপর বললো—
“হইসিলো তো…”
এইভাবেই প্রশ্ন করতে করতে আমি গল্পের ভেতরে ঢুকতে লাগলাম।
যত ভেতরে যাচ্ছি, কৌতূহল তত বাড়ছে।
জ্যামে বসে আছি। চারপাশে ভ্যাপসা গরম—অস্থির করে ফেলার মতো অবস্থা। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, আমি সেটা টেরই পাচ্ছিলাম না।
গল্পটা আমাকে পুরোটা গ্রাস করে ফেলছিল।
আমি একের পর এক প্রশ্ন করছি।
আনোয়ারও উৎসাহ নিয়ে উত্তর দিচ্ছে।
আমি মন দিয়ে শুনছি… আর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে যেন চারপাশের ভ্যাপসা গরমটাকে আরও ধোঁয়াটে করে দিচ্ছি।
জ্যামের জন্য CNG চলছিল আস্তে আস্তে—
একটু এগোয়, আবার থামে… এই অবস্থা।
আনোয়ার যে গল্পটা আমাকে বলছিল, সেটাকে আমি হুবহু তার ভাষায় বলবো না।
আমার মতো করে—
পাঠকদের সামনে তুলে ধরবো।
তার আগে… আনোয়ারের সাথে আমার সম্পর্কটা একটু বলে নেওয়া দরকার। হয়তো গল্পের সাথে খুব একটা সম্পর্ক নেই। তবুও…
বলা যাক।
আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন আনোয়ার রিকশা চালাতো।
প্রায়ই সে আমাকে বাসা থেকে স্কুলে নিয়ে যেত, আবার স্কুল থেকে বাসায় ফিরিয়ে দিত। রিকশা ভাড়া ছিল—
মাত্র তিন টাকা।
এর পর কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময়ও সে আমাকে মাঝে মাঝে রিকশায় আনা-নেওয়া করতো। তবে কলেজ বাসা থেকে দূরে ছিল বলে, তার সাথে তেমন একটা দেখা হতো না।
সময় বদলেছে, আমিও বড় হয়েছি। তবুও মাঝে মাঝে, হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যেত।
আমাদের মহল্লার পাশেই থাকতো সে। আশেপাশের প্রায় সবাই তাকে চিনতো। কোথাও যাওয়ার দরকার হলে, অনেকেই আনোয়ারকেই ডাকতো। তবে একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করতাম—আমি ডাকলে, সে অন্য সবার আগে আমাকে প্রাধান্য দিত। কেন দিত, কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি।
এরপর একসময় আমি দেশের বাইরে চলে যাই। নয় বছর পর ফিরে এসে দেখি—আনোয়ার আছে, আগের মতোই। শুধু রিকশার জায়গায় এখন CNG চালায়। মাঝে মাঝে আমার ড্রাইভার না থাকলে, আনোয়ারই আমাকে অফিসে আনা-নেওয়া করতো। এমনকি, আমার ছেলে-মেয়েদের কোথাও যেতে হলে—ওদেরও নিয়ে যেত সে।
এই কথাগুলো গল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়। তবুও বললাম—কারণ একটা সম্পর্ক ছিল, নীরব, আলাদা করে কিছু না বললেও বোঝা যায় এমন।
কিছুদিন হলো আনোয়ার স্ট্রোক করেছে। বাসায় পড়ে আছে। দেশের বাড়িতে তে চলে গেসে। ফোন দিলে অর্ধেক কথা বুঝি আর অর্ধেক বুঝি না।
আর দেখা হবে কি না—জানি না।
যাই হোক, এখন মূল গল্পে ফিরে আসি।
সালটা ছিল ২০০৯ কি ২০১০। ঠিক কোন বছর—আনোয়ার মনে করতে পারছিল না, তবে দিনটার কথা তার স্পষ্ট মনে ছিল—বৃহস্পতিবার। বিকেল গড়িয়ে আসছিল, আকাশ এতটাই মেঘলা ছিল যে চারপাশে অন্ধকার নেমে আসার মতো একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। ঠান্ডা বাতাস বইছিল, আর বাতাসে বৃষ্টির একটা আগাম আভাস ছিল। অফিস ছুটি হয়ে গেছে, রাস্তায় চিরচেনা ঢাকার জ্যাম।
খালি CNG নিয়ে আনোয়ার বাড্ডা রোডের দিকে যাচ্ছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল মোহাম্মদপুরের আশেপাশে কোনো একটা খেপ ধরা। মনে মনে ভাবছিল—যদি ঝড়টা বেশি জোরে শুরু হয়, তাহলে গাড়ি বন্ধ করে বাসায় ফিরে যাবে। ঠিক তখনই ১০০ ফিটের চলমান কন্সট্রাকশন রোডের সামনে একজন লোক, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাচ্চাকে নিয়ে হাত তুলে থামার ইঙ্গিত করলো।
আনোয়ার CNG থামালো এবং জানতে চাইল—
কোথায় যাবে। উত্তরে লোকটি জানালো, তারা আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের রাস্তার মোড় পর্যন্ত যাবে। কথা শুনে আনোয়ার ভেতরে ভেতরে খুশি হলো। রুটটা তার জন্য সুবিধাজনক। সে ঠিক করলো—ভাড়া একটু কম হলেও এই খেপটা নেবে। তবুও অভ্যাসবশত সে একটু বেশি ভাড়া চাইল। আশ্চর্যের বিষয়, লোকটি কোনো কথা না বলে সেই ভাড়াতেই রাজি হয়ে গেল।
প্যাসেঞ্জার সাইডের দরজা খুলে দিলো।
প্রথমে উঠলো বাচ্চাটি, তারপর লোকটি। সেই হিসাবে বাচ্চাটি বসল ডান পাশে, আর লোকটি বাম পাশে। আনোয়ারের ধারণা অনুযায়ী লোকটির বয়স ছিল চল্লিশের কাছাকাছি বা তার কিছু বেশি, আর বাচ্চাটির বয়স নয় থেকে এগারোর মধ্যে। তাদের পরনে ছিল আধুনিক পোশাক—লোকটির গায়ে পোলো শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট, আর বাচ্চাটির গায়ে টি-শার্ট ও থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। পায়ে কী ছিল— এই প্রশ্নে আনোয়ার পরে বলেছিল, সে খেয়াল করেনি।
চেহারার বর্ণনা জানতে চাইলে আনোয়ার বলেছিল—
লোকটির মাথায় অল্প কালো চুল, ব্যাক ব্রাশ করা। আর বাচ্চাটার চুল ছিল ঝাঁকড়া কালো। দুজনকে দেখতে অনেকটা একই রকম, গায়ের রং ফর্সা, আর নাকটা ছিল চেপ্টা ধরনের—অনেকটা চাইনিজ মানুষের মতো।
প্যাসেঞ্জার উঠার পর আনোয়ার CNG নিয়ে—
রওনা দিল আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের দিকে। বাড্ডার সামনে থেকে জ্যাম ঠেলে ইউ-টার্ন নিয়ে যখন আমেরিকান এম্বাসির কাছাকাছি পৌঁছালো, তখনই সন্ধ্যা নেমে এসেছে। জ্যাম না থাকলে হয়তো তখনো বিকেলই থাকতো, কিন্তু সেদিন বিকাল থেকেই আকাশে এমন এক অন্ধকারের ছায়া ছিল, মনে হচ্ছিল সময়টা যেন এগিয়ে গেছে—অস্বাভাবিকভাবে।
এই পুরো সময়টায় আনোয়ার একটা বিষয় খেয়াল করছিল।
প্যাসেঞ্জার দুইজন— চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা নিজেদের মধ্যেও কোনো কথা বলছিল না। তাদের তাকানোর ভঙ্গিটা অদ্ভুত ছিল— একদম স্থির, একদম মনোযোগী। যেন চারপাশের সবকিছু তারা নতুন করে দেখছে। আনোয়ারের মনে হলো—হয়তো তারা প্রথমবার ঢাকায় এসেছে।
বারিধারা রোডে উঠে জ্যাম কিছুটা কমে এলো।
আনোয়ার একটু জোরেই CNG চালাতে শুরু করলো। বাইরে তখন বাতাস বাড়ছে। সেই বাতাসে উড়ছে ঢাকার চেনা ধুলা— পাতলা, শুষ্ক, চোখে-মুখে লাগার মতো। আকাশের অবস্থা দেখে আনোয়ার বুঝতে পারছিল— ঝড় নামতে দেরি নেই। তাই তার ইচ্ছে হচ্ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মোহাম্মদপুরের ভেতরে ঢুকে পড়তে।
গুলশান সিগনালে এসে আবার থামতে হলো।
সিগন্যালের লাল আলো, চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি, আর তার মাঝখানে অকারণ অপেক্ষা— এইসব মিলিয়ে আনোয়ার একটু বিরক্ত হয়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে বললো—
“বুঝলেন ভাই, এমনই জ্যাম… তার উপর এত সিগন্যাল। মাঝে মাঝে মন চায়, সব কিছু ছাইড়া গ্রামে চইলা যাই।”
এই ধরনের কথা বললে সাধারণত প্যাসেঞ্জাররা সায় দেয়।
ঢাকার জ্যাম নিয়ে কথা বাড়ে। কিন্তু এবার কিছুই হলো না। লোকটা কোনো কথা বললো না। শুধু— দাঁত বের করে হাসলো। আনোয়ার সেই হাসিটা দেখে থমকে গেল। এই প্রথম সে লোকটার দাঁত খেয়াল করলো। দাঁতগুলো অস্বাভাবিক কালো। শুধু কালো না—
অস্বাভাবিকভাবে কালো।
রাস্তার আলো তখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি।
আধো আলো-আধো অন্ধকারে দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেই দৃশ্যটা আনোয়ারের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ধাক্কার মতো লাগলো। তার মনে প্রশ্ন জাগলো— লোকটা দেখতে এত স্বাভাবিক, এত পরিষ্কার…
তাহলে দাঁতগুলো এমন কেন?
কোনো উত্তর সে পেল না।
লোকটার পক্ষ থেকে সেই হাসি ছাড়া আর কোনো প্রতিক্রিয়া এল না।
আনোয়ার আর কথা বাড়ালো না।
চুপচাপ সামনে তাকিয়ে রইলো, সিগন্যাল সবুজ হতেই আবার CNG চালাতে শুরু করলো। এবার রাস্তা কিছুটা ফাঁকা পাওয়া গেল। CNG একটু গতি পেল।
তখনো বৃষ্টি শুরু হয়নি, কিন্তু বাতাসে ধুলা উড়ছিল।
ঢাকার অন্ধকার রাস্তায় সেই ধুলাগুলো এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়াচ্ছিল—যেন কোথাও থামার জায়গা নেই। আর সেই অস্থির বাতাসের মধ্যেই—
CNG-র ভেতরটাও ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে উঠছিল।
বনানীর কাকলীর মোড় পার হওয়ার পরই
প্রথমবারের মতো তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করলো। সাধারণত প্যাসেঞ্জাররা একটু জোরে কথা বললে CNG ড্রাইভাররা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে—কোন বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে, কেমন টোন। আনোয়ারও শব্দ পাচ্ছিল, কিন্তু কথাগুলো তার কাছে পরিষ্কার হচ্ছিল না। কারণ তারা কথা বলছিল অন্য এক ভাষায়—
যে ভাষা আনোয়ার জানে না।
শুধু শব্দের ভাঙা ভাঙা টুকরো,
আর মাঝেমধ্যে হালকা হাসি। এই হাসির ফাঁকেই আনোয়ারের চোখ গিয়ে পড়লো বাচ্চাটার দিকে। এবার সে খেয়াল করলো—বাচ্চাটার দাঁতও অস্বাভাবিক কালো। শুধু দাঁতই না, জিভ যতটুকু দেখা যাচ্ছিল—
সেটাও কালো।