Reading Copy 23
রোমান্টিক গল্প
রোমান্টিক গল্প
ধরণ: রোমান্টিক গল্প
লেখাটির প্রথম অনলাইন প্রকাশ:
Facebook (লেখকের নিজস্ব প্রোফাইল ও অন্যপ্রকাশ সাহিত্য গ্রুপ)
প্রকাশের তারিখ: ৯ জুলাই, ২০২৬
লাইব্রেরিটা শহরের পুরোনো একটা ভবনের তৃতীয় তলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে পড়ে, সেটা হলো দেয়ালের রং উঠে যাওয়া অংশগুলো। আর ভেতরে ঢুকলেই সময়টা যেন একটু ধীর হয়ে যায়।
কাঠের শেলফ, ধুলোমাখা বইয়ের গন্ধ, আর জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া নরম আলো—সব মিলিয়ে লাইব্রেরিটা শুধু বইয়ের জায়গা না, এটা যেন এক ধরনের নীরব গল্পের ঘর।
এই লাইব্রেরির প্রতিটি বইয়ের একটা করে call number ছিল। হাজারো বইয়ের ভিড়ে কেউ হারিয়ে যেত না, কারণ প্রতিটা বই তার নিজের নামের মতোই একটা নম্বর বহন করত।
এই লাইব্রেরিতে একটা বই ছিল—
শিরোনাম: “নীরবতার ভাষা”।
বইটা নতুন না। পুরোনো বইয়ের একটা আলাদা গন্ধ থাকে—যেটা শুধু পাতা থেকে আসে না, মানুষের হাতের ছোঁয়া থেকেও আসে। এই বইটার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।
বইটার মোট পাঁচটি কপি ছিল। লাইব্রেরিতে এটা খুবই স্বাভাবিক—একই বইয়ের একাধিক কপি থাকতেই পারে।
এর মধ্যে দুটি কপি অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। কেউ খুব বেশি খোঁজও করেনি, কারণ লাইব্রেরিতে বই হারানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবুও বাকি তিনটি কপির মধ্যে একটা কপি যেন আলাদা হয়ে উঠছিল।
যার call number ছিল Reading Copy 23।
বইটার কভারটা একটু ছেঁড়া। পাতাগুলোর কোণ ভাঁজ হয়ে আছে। কোথাও কোথাও পুরোনো আঠা খুলে গিয়ে পাতাগুলো আলগা হয়ে গেছে। তবুও এই বইটাই সবচেয়ে বেশি ঘুরতে লাগল এক শেলফ থেকে আরেক শেলফে, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে।
লাইব্রেরিয়ানরা দেখল, প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ এই বইটা নিচ্ছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—সবসময় একই মানুষ না।
কেউ গুরুত্ব দেয়নি। লাইব্রেরিতে এমন ছোটখাটো অদ্ভুত ঘটনা প্রায়ই হয়।
কিন্তু Reading Copy 23-এর ভেতরে তখন অন্য কিছু ঘটছিল।
এই বইটি প্রথম নেয় মিরাজ।
মিরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। খুব বেশি কথা বলে না। তার মধ্যে একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে—সে মানুষের চেয়ে বইয়ের সাথে বেশি সময় কাটায়। বিকেল হলেই সে লাইব্রেরিতে চলে আসে। শেলফের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখে, হাতে নিয়ে একটু উল্টায় , তারপর যেটা ভালো লাগে সেটাই নিয়ে বসে পড়ে।
সেদিনও সে এসেছিল।
শেলফের মাঝখান থেকে সে হাতে নেয় “নীরবতার ভাষা”—Reading Copy 23।
বইটা হাতে নিয়ে সে বসে পড়ে জানালার পাশে। বাইরের আলোটা ধীরে ধীরে পাতার উপর এসে পড়ছিল।
সে পড়তে থাকে।
সময় কেটে যায় নিজের মতো করে। কখনো খেয়াল থাকে না, কখনো পাতাও উল্টে যায় অজান্তে। একসময় সে প্রায় তিন ভাগ বই শেষ করে ফেলে।
৪৬ নম্বর পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে হঠাৎ ৪৭ নম্বর পাতায় তার চোখ আটকে যায়।
একটা চুল।
কারো হয়তো অজান্তে পড়ে গিয়েছিল। ইচ্ছা করে কেউ রাখেনি। তবুও পাতার ভেতর সেটা খুব স্পষ্টভাবে পড়ে ছিল।
মিরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
কোনো শব্দ না করেই , আঙুল দিয়ে চুলটা তুলে টেবিলের পাশে রেখে দেয়।
বইটা বন্ধ করে সে চুপচাপ বসে থাকে। এরপর শেষ পাতার ভেতরে একটি ছোট কাগজ ভাঁজ করে রেখে দেয়।
লেখা ছিল—
“তুমি কি আবার আসবে?”
সে নিজেও জানত না কেন লিখেছে। শুধু মনে হয়েছিল, কেউ একজন আছে—যে এই বইটি তার মতোই অনুভব করে।
পরদিন লাইব্রেরিতে আসে জান্নাত ।
জান্নাত খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে। লাইব্রেরিতে তাকে প্রায়ই দেখা যায়, কিন্তু খুব কম মানুষই তার সাথে কথা বলে। সে যেন নিজের একটা আলাদা জগতে থাকে—যেখানে শব্দ কম, কিন্তু অনুভূতি অনেক।
লাইব্রেরিটাই তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সে সাধারণত কোনো বই দু’বার পড়ে না। একবার পড়ে শেষ করলে আবার সেই বইয়ের কাছে ফিরে যায় না।
কিন্তু “নীরবতার ভাষা” বইটার ক্ষেত্রে তার এই নিয়মটা ভেঙে গেছে।
Reading Copy 23 ।
সে সবসময় এই কপিটাই নেয়।
সেদিনও সে বইটা নিয়ে একটা নির্জন টেবিলে গিয়ে বসে। জানালার পাশে বসলে বাইরের আলো পাতার ওপর খুব নরমভাবে পড়ে।
সে বই খুলতেই হঠাৎ শেষ পাতার ভেতর থেকে ভাঁজ করা কাগজটা নিচে পড়ে যায়।
জান্নাত কিছুক্ষণ কোনো নড়াচড়া করে না। শুধু কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে সেটা তুলে নেয়।
চোখে বিস্ময় নেই, আবার স্বাভাবিকও না। যেন সে আগে থেকেই জানত এমন কিছু একটা থাকবে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে।
তারপর হালকা করে হাসে।
একটা ছোট, খুব সাধারণ হাসি—যেটা বাইরে থেকে কেউ দেখলে কিছুই বুঝবে না, কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু বদলে যায়।
সে তার ব্যাগ থেকে কলম বের করে।
কাগজটার নিচে লিখে রাখে—
“হ্যাঁ, আসবো। কিন্তু তুমি কে?”
লেখা শেষ করে সে আরও কিছুক্ষণ বসে থাকে।
তারপর বইটা খুব যত্ন করে বন্ধ করে, আবার আগের জায়গায় রেখে দেয়।
যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু তার ভেতরের একটা অংশ তখন একটু একটু করে জেগে উঠছে।
এভাবেই শুরু হয় এক অদ্ভুত যোগাযোগ।
কেউ কাউকে দেখে না।
কেউ কারো নাম জানে না।
শুধু একটি বইয়ের পাতার ভেতর দিয়ে কথা চলতে থাকে—একটা নীরব ভাষায়, যেটা শব্দের চেয়েও গভীর।
মিরাজ পরদিন আবার লাইব্রেরিতে আসে।
বইটা হাতে নিতেই তার বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে। যেন কোনো অদৃশ্য টান তাকে বইটার দিকে টেনে এনেছে।
সে বসে পড়ে জানালার পাশে। বই খুলে শেষ পাতায় হাত দিতেই আগের ভাঁজ করা কাগজটা চোখে পড়ে।
ধীরে ধীরে সে খুলে দেখে—
কেউ উত্তর দিয়েছে।
মিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তার মুখে কোনো বড় অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত এক আনন্দ জন্ম নেয়—যেটা বোঝানো যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
সে কলম বের করে।
কাগজটার নিচে লিখে—
“আমি সেই মানুষ, যে তোমার মতোই এই বইটা বারবার পড়ি।”
দিন যেতে থাকে।
লাইব্রেরির ভেতরে একটা ছোট্ট পরিবর্তন যেন কেউ খেয়ালই করতে পারে না, তবুও সেটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
Reading Copy 23।
বইটা প্রায় প্রতিদিনই কারও না কারও হাতে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—দু-তিন ঘণ্টার ব্যবধানে বইটা হাত বদল হচ্ছে।
একজন লাইব্রেরিয়ান একদিন হালকা হেসে বলেছিল,
“বইটা যেন কারো অপেক্ষায় থাকে… তারপর আবার চলে যায়।”
কেউ কথাটা খুব গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু বাস্তবে সত্যিই তাই হচ্ছিল।
জান্নাত আর মিরাজ এখন নিয়মিত চিঠি লিখে কথা বলতে শুরু করেছে।
কোনো দিন তাদের দেখা হয় না, তবুও তারা একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে—একটা বইয়ের পাতার ভেতরে।
একদিন জান্নাত লিখল—
“তুমি কি লাইব্রেরির পেছনের টেবিলের জানালার পাশে বসো?”
মিরাজ কাগজটা পড়ে একটু থমকে গেল।
সে সত্যিই প্রতিদিন সেই জায়গাটাতেই বসে। যেন জায়গাটা তার অজান্তেই অভ্যাস হয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে লিখল—
“হ্যাঁ। তুমি কীভাবে জানলে?”
পরদিন, পরের পাতায় জান্নাতর লেখা পেল।
“আমি প্রায়ই তোমাকে দেখি… তুমি খেয়াল করো না ।”
মিরাজ চুপ করে থাকে।
লাইব্রেরির শব্দ তখনও আছে, মানুষ আছে, পাতা ওল্টানোর শব্দ আছে—কিন্তু তার ভেতরের জগৎটা হঠাৎ করে একটু নীরব হয়ে যায়।
কারণ সে বুঝতে পারে, কেউ একজন এতদিন ধরে তাকে দেখে আসছে… আর সে নিজেও জানত না।
মিরাজ কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে।
তারপর হঠাৎ তার চোখ চলে যায় সামনে দিকে।
লাইব্রেরির সামনের সারিতে, জানালার পাশে একটা মেয়ে বসে আছে।
মাথা নিচু করে বই পড়ছে। আলোটা তার চুলের ওপর পড়ে নরম একটা রেখা তৈরি করেছে।
মিরাজ তাকিয়ে থাকে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ তোলে।
চোখে চোখ পড়তেই সে হালকা করে হাসে।
কোনো শব্দ নেই, কোনো ইশারা নেই—তবুও একটা পরিচয়ের মতো কিছু সেখানে তৈরি হয়ে যায়।
সেই দিনই প্রথম তারা বুঝতে পারে—এটা শুধু বইয়ের ভেতরের যোগাযোগ নয়, এটা বাস্তব।
তবুও তারা সরাসরি কিছু বলে না।
শুধু চোখে চোখে একটা নীরব বোঝাপড়া চলতে থাকে।
পরের দিন মিরাজ কাগজে লিখে—
“তুমি কি সত্যিই আমি যাকে ভাবছি?”
জান্নাত উত্তর লিখে—
“তুমি যদি সেই মানুষ হও, তাহলে হ্যাঁ।”
দিনগুলো ধীরে ধীরে খুব শান্ত হয়ে উঠেছিল।
কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো অস্থিরতা নেই।
শুধু একটা বই, কয়েকটা ছোট ছোট লেখা, আর তার ভেতরে গড়ে ওঠা অদৃশ্য একটা সম্পর্ক।
একদিন মিরাজ লিখল—
“আগামীকাল কি আমরা একই টেবিলে বসব?”
জান্নাত অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর খুব সাধারণভাবে লিখল—
“আমি তো সবসময় সেই টেবিলেই থাকি।”
পরের দিন বিকেলটা ছিল একটু অন্যরকম। আকাশটা মেঘলা, বাতাসে একটা নরম ঠান্ডা ভাব। লাইব্রেরির ভেতর আলোটা একটু হলুদ হয়ে এসেছে।
জানালার পাশে একটি টেবিল।
দুটি চেয়ার।
মিরাজ আর জান্নাত সেখানে বসে আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—তারা এখনো একে অপরের সাথে ঠিকমতো কথা বলছে না।
যেন শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি স্বাভাবিক।
জান্নাত ধীরে ধীরে মুখ তুলে বলল—
“তুমি কি জানো… আমি প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিলাম তুমি কে?”
মিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করে—
“কিভাবে?”
জান্নাত হালকা হাসল।
“কারণ তুমি যখন চিরকুট রাখো, তুমি সবসময় বইটা একই পাতায় ভাঁজ করে রাখো… আর আমি যখন লিখি, আমি সেই ভাঁজটা ঠিক করে রেখে দিই। আমি দেখেছি—তুমি সবসময় সেই ভাঁজের জায়গাটাই খোঁজো ”
মিরাজ চুপ করে থাকে।
জান্নাত আবার বলল—
“আর তাছাড়া… তুমি যখন বইটা রেখে যাও, আমি প্রায়ই ঠিক তার পরপরই বইটা নিই। আমি জানি তুমি কখন আসো। তাই আমি অপেক্ষা করি সেই সময়টার জন্য। আমি সবসময় বইটা একই জায়গায় রাখি। যখন দেখি বইটা সেখানে নেই, তখন বুঝে যাই—তুমি এসেছো। ”
মিরাজের চোখে একটা বিস্ময় ধীরে ধীরে নেমে আসে।
সে বুঝতে পারে—তারা এতদিন ধরে একই জায়গায় ছিল, শুধু কখনো খেয়াল করেনি।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ে। কিন্তু ভেতরে, তাদের মাঝে আর কোনো অচেনা দূরত্ব থাকে না।
মিরাজ খুব আস্তে বলল—
“তাহলে আমরা কি এখন থেকে আর বইয়ের ভেতরে কথা বলব না?”
জান্নাত তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর খুব সহজভাবে হাসল।
“না… এখন আমরা বইয়ের বাইরে কথা বলব।”
লাইব্রেরির সেই পুরোনো বইটা এখনো সেখানে আছে—Reading Copy 23।
শেলফের এক কোণে।
কিন্তু এখন তার ভেতরে আর কোনো চিরকুট নেই। কারণ চিঠি আর পাতার ভেতরে থাকে না।
চিঠি এখন থাকে দুইটি মানুষের মাঝখানে—
লেখাটি পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। নিচের যেকোনো একটি অপশন নির্বাচন করুন।